প্রকাশ :: ... | ... | ...

মেসির বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: এক বিশ্বকাপজয়ী মহাকাব্য


সংযুক্ত ছবি

লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দৃশ্যটি হয়তো তাঁর স্বপ্নের মতো হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু একটি ফাইনালের ফল দিয়ে মেসির ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে বিচার করা অসম্ভব। কারণ এই দীর্ঘ পথচলায় ছিল তীব্র হতাশা, কান্না, অবসর ঘোষণা, প্রত্যাবর্তন, একের পর এক ফাইনালে ব্যর্থতা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে তুলে নেওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনেছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর চূড়ান্ত পরিসংখ্যান—**২০৭ ম্যাচ, ১২৫ গোল**। দুটিই দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি: এক নজরে | বিষয় | পরিসংখ্যান | | আন্তর্জাতিক অভিষেক | ১৭ আগস্ট ২০০৫ | আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার | ২১ বছর | ম্যাচ | ২০৭ | গোল | ১২৫ | শেষ ম্যাচ | ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল | বিশ্বকাপ | ১টি — ২০২২ | কোপা আমেরিকা | ২টি — ২০২১, ২০২৪ | ফিনালিসিমা | ১টি | অলিম্পিক স্বর্ণ | ১টি — ২০০৮ | বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ | ৬টি | বিশ্বকাপ ম্যাচ | ৩০ | বিশ্বকাপ গোল | ২১ আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু গোলদাতা হিসেবে নয়। তিনি ছিলেন গোলের স্রষ্টা, প্লেমেকার, অধিনায়ক এবং দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। শুরুটা হয়েছিল ২০০৫ সালে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির। সেই ম্যাচে অল্প সময় মাঠে ছিলেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠেন। ২০০৬ বিশ্বকাপে প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখেন ১৯ বছর বয়সী মেসি। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—টানা ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। ফিফার হিসাবে, ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষে তাঁর বিশ্বকাপ ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়ায় **৩০**। বিশ্বকাপে মেসির পরিসংখ্যান বিশ্বকাপই মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশ্বকাপে মেসি: * ম্যাচ: ৩০ * বিশ্বকাপ: ৬টি * গোল: ২১ * বিশ্বকাপ ফাইনাল: ৩টি * বিশ্বকাপ শিরোপা: ১টি * গোল্ডেন বল: ২টি ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে মেসি দুটি গোল করেন এবং টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হয়। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর মেসি বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হিসেবে ৩০ ম্যাচে পৌঁছান। একই সঙ্গে টুর্নামেন্টে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১। বিশ্বকাপে তাঁর আরেকটি অসাধারণ রেকর্ড হলো—টানা **৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল**। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শুরু হওয়া সেই ধারাটি ২০২৬ বিশ্বকাপেও অব্যাহত থাকে। ফিফার হিসাবে এটিই বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক টানা ম্যাচে গোল করার রেকর্ড। ২০২২: যে বিশ্বকাপ বদলে দিল সবকিছু মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ২০২২ সালে। এর আগে তিনটি বড় ফাইনালে ব্যর্থতা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়। ২০১৬ সালের পর হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু ফিরে এসে তিনি আর থামেননি। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হয় সাফল্যের নতুন অধ্যায়। এরপর কাতারে বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ। মেসি দুই গোল করেন। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা জয় পায়। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। আর মেসি পান তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি। শুধু বিশ্বকাপ নয়, কোপা আমেরিকাতেও আধিপত্য মেসির আন্তর্জাতিক সাফল্যের বড় অংশ এসেছে কোপা আমেরিকায়। ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। এটি ছিল মেসির সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের মধ্যে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা জেতে— ২০২১ কোপা আমেরিকা → ২০২২ বিশ্বকাপ → ২০২৪ কোপা আমেরিকা। এই ধারাবাহিক সাফল্যই মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়। ফিনালিসিমার শিরোপাও আছে ২০২২ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিপক্ষে ফিনালিসিমায় জয় পায় আর্জেন্টিনা। মেসি সেই ম্যাচে গোল না করলেও দুটি অ্যাসিস্ট করেন। ফলে তাঁর আন্তর্জাতিক ট্রফির তালিকায় যুক্ত হয় আরও একটি বড় শিরোপা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১২৫ গোল ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল—গোলের সংখ্যায় মেসি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবার ওপরে। অর্থাৎ প্রতি ১.৬৬ ম্যাচে প্রায় একটি করে গোল করেছেন তিনি। তবে তাঁর গোলগুলোকে শুধু সংখ্যায় বিচার করলে তাঁর অবদান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বহু ম্যাচে তিনি গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্ট, সুযোগ তৈরি এবং আক্রমণ পরিচালনার মাধ্যমে ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেছেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও তাঁর অবদান ছিল বিশাল। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে মেসির গোলসংখ্যা **৩৬**, যা এই অঞ্চলের বাছাইপর্বে তাঁর অসাধারণ প্রভাবের প্রমাণ। সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তনের গল্প মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় সম্ভবত ২০১৬ সালের পরের সময়। তিনটি বড় ফাইনালে ব্যর্থতার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির গল্প বুঝি এখানেই শেষ। কিন্তু তিনি ফিরে আসেন। এরপর বদলে যায় পুরো গল্প। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, শুরুর দিকের সমালোচনা ও ধারাবাহিক ফাইনাল-ব্যর্থতা পেরিয়ে মেসি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ইতিহাসে নিজের আলাদা উত্তরাধিকার তৈরি করেছেন। মেসির বিশ্বকাপের ছয় অধ্যায় ২০০৬ — জার্মানি: প্রথম বিশ্বকাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিদায়। ২০১০ — দক্ষিণ আফ্রিকা: দিয়েগো ম্যারাডোনার কোচিংয়ে খেলেন। আবারও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে বিদায়। ২০১৪ — ব্রাজিল মেসির নেতৃত্বে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটশের গোলে জার্মানির কাছে হার। মেসি জেতেন গোল্ডেন বল। ২০১৮ — রাশিয়া শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। ২০২২ — কাতার ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মেসি। ২০২৬ — উত্তর আমেরিকা আবার ফাইনালে আর্জেন্টিনা। এবার স্পেনের কাছে পরাজয়। এটিই মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ব্যক্তিগত অর্জনের ভাণ্ডার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসির উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে— * বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল — ২০১৪ * বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল — ২০২২ * বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ — ৩০ * বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের মধ্যে অন্যতম — ২১ * বিশ্বকাপে টানা সর্বাধিক ম্যাচে গোল — ৯ * আর্জেন্টিনার সর্বাধিক ম্যাচ — ২০৭ * আর্জেন্টিনার সর্বাধিক গোল — ১২৫ ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি একাধিক রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেছেন। টুর্নামেন্টে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ড **২৩টি** করেছেন এবং বক্সের বাইরে থেকে সর্বাধিক গোলের রেকর্ডও ৭টিতে উন্নীত করেছেন। মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা মেসির গল্প শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি অপেক্ষার গল্প। একজন খেলোয়াড়, যিনি বার্সেলোনায় প্রায় সবকিছু জিতেও জাতীয় দলের হয়ে শিরোপার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন। একজন খেলোয়াড়, যিনি ফাইনালে হেরে কেঁদেছেন। অবসর ঘোষণা করেছেন। আবার ফিরেছেন। আবার হেরেছেন। তারপরও থামেননি। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছেন। রয়টার্সের ভাষায়, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ না পেলেও তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এরই মধ্যে পূর্ণতা পেয়েছিল—বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বাধিক ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড নিয়ে। শেষ অধ্যায়েও মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা না পেলেও তাঁর বিদায় কোনোভাবেই ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং ২১ বছর আগে শুরু হওয়া যাত্রার এটি ছিল এক আবেগঘন সমাপ্তি। ২০৭ ম্যাচ। ১২৫ গোল। ৩০ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ২১ বিশ্বকাপ গোল। ২ কোপা আমেরিকা। ১ বিশ্বকাপ। ২ বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল। সংখ্যাগুলো মেসির ক্যারিয়ারের ব্যাপ্তি বোঝায়। কিন্তু তাঁর গল্পের আসল মূল্য হয়তো সংখ্যার বাইরে। কারণ মেসি শুধু আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেননি—তিনি একটি প্রজন্মকে আর্জেন্টিনার ফুটবলের সঙ্গে নতুন করে আবেগের বন্ধনে যুক্ত করেছেন। একসময় যে শিশুটি ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছিল, দুই দশক পর সেই শিশুই হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও সবচেয়ে বেশি গোল করা ফুটবলার। মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া পরিসংখ্যান ও গল্প—ফুটবল ইতিহাসে বহু বছর ধরে আলোচিত হবে।