লিওনেল মেসির বিদায়ের রাত শেষ হয়েছে। মনুমেন্তালে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছে জয়, আর মেসি গোল ও জোড়া অ্যাসিস্টে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটিকে করে নিয়েছেন স্মরণীয়। কিন্তু উৎসবের রাত পেরোতেই সামনে এসেছে নতুন প্রশ্ন—মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার নতুন যাত্রায় কোচ হিসেবে থাকছেন তো লিওনেল স্কালোনি? বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিলেও নিজের ইচ্ছার কথা স্পষ্ট করেছেন স্কালোনি। জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনি আর্জেন্টিনার দায়িত্ব চালিয়ে যেতে চান। তবে চুক্তি নবায়ন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ‘সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আমি কোচ হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাব। মেসি যে উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য। আমি সেটিই সঙ্গে করে নিয়ে যাব। মাঠে তার মতো আর কখনো কাউকে দেখা যাবে না। তার জন্য আমরা চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব,’ বলেন স্কালোনি। আর্জেন্টিনার সঙ্গে স্কালোনির বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ডিসেম্বরে। বিশ্বকাপের পরও তাকে দায়িত্বে রাখার আগ্রহ রয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ)। তবে চুক্তি নবায়ন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি হয়নি। স্কালোনির কথাতেও তাই ছিল অপেক্ষার সুর—‘এখনো এ বিষয়ে নতুন কোনো আপডেট নেই।’ ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেওয়া স্কালোনির হাত ধরেই বদলে যায় দলটির চেহারা। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ—একটির পর একটি বড় শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা পরিণত হয় আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটিতে। সেই সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। এবার সেই মেসিই নেই। স্কালোনির কাছে এটিই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। মেসির উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়া শুধু একজন নতুন অধিনায়ক বা নতুন তারকা খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়; তার তৈরি করা আবেগ, নেতৃত্ব ও মাঠের প্রভাবের বিকল্পও তৈরি করতে হবে। মেসিকে ছাড়া সামনে কঠিন সময় আসতে পারে—এ কথা মেসি নিজেই বিদায়ী বক্তব্যে বলেছেন। স্কালোনিও তার সঙ্গে একমত। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ নন তিনি। বরং নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের ঘিরে দল পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখছেন। ‘কঠিন হতে যাচ্ছে, সে নিজেও সেটি বলেছে। গত কয়েক বছরে আমরা যা পেয়েছি, তা স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। সামনে কঠিন সময় আসতে পারে। আমরা সেগুলোর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমাদের সঙ্গে তরুণ, নতুন খেলোয়াড়রা আছে, যারা আমাদের অনেক কিছু দেবে,’ বলেন স্কালোনি। তবে মেসির জায়গাটি যে অন্য কারও পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়, সেটিও অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। নতুন দল তৈরি করা যাবে, নতুন তারকা উঠে আসবে, কিন্তু মেসি যে অনুভূতি তৈরি করতেন, সেটি আর ফিরে আসবে না। স্কালোনির ভাষায়, ‘আপনার পাশে তাকে থাকার যে অনুভূতি, তার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না। মানুষকে বোঝানোও খুব কঠিন, এটি আপনাকে অনুভব করতে হবে। এটি তুলনাহীন।’ মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ—একটি সফল দলের পরিচিত কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মকে সামনে নিয়ে আসা। স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে সেই ধারাবাহিকতার অভিজ্ঞতা। মেসিকে ঘিরে তৈরি দলকে তিনি ইতোমধ্যে একাধিক সাফল্যের দিকে নিয়ে গেছেন; এবার তাকে গড়তে হবে মেসিবিহীন দল। স্কালোনি বলেন, ‘আমরা যতই দলটাকে নতুন করে গড়ে তুলি না কেন, নতুন যারা উঠে আসছে তাদের নিয়ে যতই দারুণ একটি দল তৈরি করি না কেন, আমি আর কারও মধ্যে তার মতো সেই আভা দেখিনি। সে যে অনুভূতি তৈরি করত, তা আর থাকবে না। আমরা নতুন কিছু উপায় খুঁজে বের করব, কিন্তু সেই অনুভূতিটা আর থাকবে না।’ তারপরও পথ থেমে থাকার সুযোগ নেই। মেসির অধ্যায় শেষ হয়েছে, কিন্তু আর্জেন্টিনার গল্প শেষ হয়নি। বরং শুরু হচ্ছে এমন এক সময়, যেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকে প্রমাণ করতে হবে—একজন কিংবদন্তিকে হারিয়েও কীভাবে একটি দল নিজের পরিচয় ধরে রাখতে পারে। স্কালোনি সেই পথের দায়িত্বে থাকবেন কি না, তার আনুষ্ঠানিক উত্তর এখনো আসেনি। তবে বিদায়ের রাতেই নিজের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন তিনি—সুযোগ থাকলে থেকে যেতে চান। কারণ মেসির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে সঙ্গে নিয়েই আর্জেন্টিনার নতুন অধ্যায় শুরু করতে চান এই কোচ। মেসি নেই। তার জায়গা পূরণ করার কেউ নেই—এ কথা স্কালোনিও জানেন। কিন্তু তার বিশ্বাস, নতুনদের নিয়ে নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব। আর সেই পথের প্রথম পরীক্ষাই হবে কিংবদন্তিকে ছাড়াই আর্জেন্টিনার নতুন পরিচয় গড়ে তোলা।