বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দল আজ রাতে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টের বাছাইপর্ব খেলতে উজবেকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হবে। দেশের মাটিতে কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট বা বাছাইপর্বে অংশ নিতে যাওয়ার আগে কোচ ও অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ফুটবলের প্রায় অলিখিত নিয়ম। তবে এবার সেই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। দল উজবেকিস্তান যাওয়ার আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন না কোচ জেরার্ড জোন্স ও অধিনায়ক। তাঁদের অনুপস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন দলের ম্যানেজার সামিদ কাশেম ও টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটু। আর কোচ-অধিনায়ককে ছাড়া সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করায় শুরুতেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন ম্যানেজার। সংবাদ সম্মেলনে বারবার উঠে আসে কোচ ও অধিনায়কের অনুপস্থিতির বিষয়টি। কেন তাঁরা আসেননি, সেই প্রশ্নের জবাবে সামিদ কাশেম বলেন, উজবেকিস্তানে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। এ কারণে দলের সদস্যরা একাধিক গ্রুপে দেশ ছাড়ছেন। কোচ ও খেলোয়াড়দের মনোযোগ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে কারণেই তাঁদের সংবাদ সম্মেলনে আনা হয়নি। ম্যানেজার বলেন, ‘উজবেকিস্তানে সরাসরি ফ্লাইট নেই, তাই আমাদের দল আজ একাধিক গ্রুপে যাচ্ছে। কোচ-খেলোয়াড়দের মনোযোগ যেন বিঘ্ন না ঘটে, এজন্য তারা নেই। এটা আমাদের সাধারণ রীতি নয়। এজন্য ম্যানেজার হিসেবে আমি দুঃখিত।’ তবে সংবাদ সম্মেলনে কোচ-অধিনায়কের অনুপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করলেও সাম্প্রতিক সময়ে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ক্যাম্পে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে স্বস্তিতে থাকতে পারেনি বাফুফে। বিশেষ করে ব্রিটিশ কোচ জেরার্ড জোন্স ও সহকারী কোচ আতিকুর রহমান মিশুর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় ম্যানেজারকে। গত বুধবার ক্যাম্পে দুই কোচের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এর এক দিন পর জেরার্ড জোন্স হোটেলে পুলিশ ডাকেন। এরপর থেকেই দুই কোচের মধ্যে দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘটনার পরও দুজনই বাংলাদেশ দলের সঙ্গে উজবেকিস্তান সফরে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় দলের ভেতরের পরিবেশ কতটা স্বাভাবিক, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ম্যানেজার সামিদ কাশেম অবশ্য দাবি করেছেন, বর্তমানে ক্যাম্পের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, ‘এখন ক্যাম্পে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সবাই এখন ভালো মুডে রয়েছে।’ তবে ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কেন তদন্ত শেষ করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নও ওঠে সংবাদ সম্মেলনে। বিশেষ করে সফরের আগেই বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত কি না, জানতে চাওয়া হলে ম্যানেজার বলেন, সফরের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে চাননি তাঁরা। পাশাপাশি ঘটনার বিষয়ে তথ্য পেতেও তাঁদের সময় লেগেছে বলে জানান তিনি। সামিদ কাশেম বলেন, ‘সফরের আগে আমরা এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইনি, যেন দলে প্রভাব না পড়ে। তাছাড়া তথ্য পেতেও দেরি হয়েছে।’ ম্যানেজারের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর সাইফুল বারী টিটুও এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন। কোচ মিশু ঘটনার দিনই ফেডারেশনকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে টিটুর বক্তব্যে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ঘটনার দিন জেরার্ড জোন্স বা মিশু কেউ তাঁকে বিষয়টি জানাননি। বরং শুক্রবার মিশু তাঁকে বিষয়টি জানিয়েছেন। সাইফুল বারী টিটু বলেন, ‘বুধবার জেরার্ড কিংবা মিশু কেউ জানায়নি, শুক্রবার আমাকে মিশু জানিয়েছে।’ অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ নিয়ে সমস্যা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে সাফ টুর্নামেন্টেও কোচ নিয়ে জটিলতায় পড়েছিল দল। ব্রিটিশ কোচ মার্ক কক্সের ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরে তাঁর জায়গায় আরেক ব্রিটিশ কোচ জেরার্ড জোন্সকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুই কোচের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সামিদ কাশেমের সম্পৃক্ততা ছিল। এবার তিনি দলের ম্যানেজারের দায়িত্বেও রয়েছেন। ফলে ক্যাম্পে কোচদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনায় ম্যানেজারের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে সামিদ কাশেম নিজেও ম্যানেজার হিসেবে ঘটনার আংশিক দায় স্বীকার করেছেন। কোচ-অধিনায়ক সংবাদ সম্মেলনে না থাকায় দলের প্রস্তুতি ও লক্ষ্য নিয়েও সরাসরি তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাধারণত এ ধরনের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা কোচের কাছে দলের প্রস্তুতি, প্রতিপক্ষ, কৌশল এবং টুর্নামেন্টের লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চান। অধিনায়কের কাছ থেকেও দলের আত্মবিশ্বাস ও মাঠের পরিকল্পনা সম্পর্কে বক্তব্য পাওয়া যায়। এবার সেই সুযোগ না থাকায় দলের প্রস্তুতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় টেকনিক্যাল ডিরেক্টরকে। সাইফুল বারী টিটু দলের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ম্যানেজার সামিদ কাশেমও বাছাইপর্ব পেরিয়ে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত পর্বে খেলার আশা প্রকাশ করেছেন। বাছাইপর্বের গ্রুপপর্ব শেষে আট গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন এবং সেরা সাত রানারআপ পরবর্তী পর্বে খেলার সুযোগ পাবে। ফলে বাংলাদেশের সামনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সুযোগও রয়েছে। তবে মাঠের লড়াইয়ের আগে দলের ভেতরের পরিবেশ, কোচিং স্টাফের সমন্বয় এবং ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। উজবেকিস্তান সফরের আগে সংবাদ সম্মেলনে কোচ ও অধিনায়কের অনুপস্থিতি হয়তো দলের ভ্রমণসূচি ও প্রস্তুতির ব্যাখ্যায় সাময়িকভাবে যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দুই কোচের হাতাহাতি, তদন্তে বিলম্ব এবং আগের কোচিং-সংক্রান্ত জটিলতার সঙ্গে বিষয়টি মিলিয়ে দেখলে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এখন মাঠে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা ও কোচিং স্টাফের সমন্বয় কতটা কার্যকর থাকে, সেটিই দেখার বিষয়।