২০২৬-২৭ মৌসুমের ঘরোয়া ফুটবল শুরুর সূচি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। ২১ আগস্ট চ্যালেঞ্জ কাপ বাতিলের পর বাফুফে ২৫ আগস্ট ফেডারেশন কাপ এবং ২৮ আগস্ট লিগ শুরুর যে পরিকল্পনা করেছিল, সেখান থেকেও সরে এসেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ এবং ২২ সেপ্টেম্বর মাঠে গড়াবে ফেডারেশন কাপ। বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার লিগের ক্লাবগুলোর কাছে পাঠানো চিঠিতে নতুন সূচির কথা জানিয়েছেন। এর ফলে আগস্টে ঘরোয়া ফুটবল শুরুর সম্ভাবনা আপাতত শেষ হয়ে গেল। তবে নতুন সূচিতেও জাতীয় দলের ক্যাম্প ও ঘরোয়া ফুটবলের মধ্যে বড় ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ফিফা উইন্ডো। এই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হামজা চৌধুরীদের আসিয়ান কাপের ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। সাধারণত ফিফা উইন্ডোর সময় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সহজে ছাড়তে হয় বলে বিশ্বজুড়েই ঘরোয়া লিগের সূচি সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশে এবার সেই সমন্বয়ের বদলে ফিফা উইন্ডোর মধ্যেই লিগ ও ফেডারেশন কাপ চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে যেসব ক্লাবে জাতীয় দলের একাধিক খেলোয়াড় রয়েছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে খর্বশক্তির দল নিয়ে মাঠে নামতে হতে পারে। এদিকে প্রায় দুই মাস ধরে অধিকাংশ ফুটবলার নিয়মিত অনুশীলনের বাইরে রয়েছেন। ফর্টিজ এফসি ও বাংলাদেশ পুলিশ ছাড়া বেশির ভাগ ক্লাবের খেলোয়াড়দের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় সেপ্টেম্বরের ফিফা উইন্ডোর আগে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ফিটনেস ফেরানোও বাফুফের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেডারেশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট থেকে জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরু হতে পারে। ক্যাম্পে থাকা ফুটবলাররা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আবার ক্লাবে ফিরবেন। ফলে ক্লাবগুলোকে নিজেদের দলীয় প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছাড়তে হবে। ক্লাবগুলো অবশ্য বিষয়টি সহজভাবে নিচ্ছে না। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি এখনো চিঠি পাইনি। তবে যতটুকু শুনেছি, এতে বুঝলাম ক্লাবের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা হবে, ক্লাব-ফেডারেশন আলোচনার ভিত্তিতে।’ জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে তৈরি হওয়া সংকটের পাশাপাশি ক্লাব নিবন্ধন নিয়েও জটিলতা রয়েছে। ২১ আগস্ট খেলোয়াড়দের প্রথম ধাপে নিবন্ধনের শেষ দিন থাকলেও আগস্টে খেলা শুরু না হওয়ায় ওই অন্তর্বর্তী নিবন্ধন সময়সীমা তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলোয়াড় নিবন্ধন করা যাবে। তবে খেলোয়াড় নিবন্ধনের আগে ক্লাব লাইসেন্সিং সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। ফিফার নিষেধাজ্ঞা থাকায় ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ও বসুন্ধরা কিংস এখনো ক্লাব লাইসেন্সিং শেষ করতে পারেনি। বকেয়া পরিশোধ করে লাইসেন্স সম্পন্ন করার জন্য দুই ক্লাবকে ২৮ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। বসুন্ধরা কিংসের ওপর বর্তমানে ফিফার আটটি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কয়েক দিন আগে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে ক্লাবগুলোর বৈঠকে কিংস কর্তৃপক্ষ সাত কর্মদিবস সময় চেয়েছিল। ঘরোয়া ফুটবলের সূচি নিয়ে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়েছে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগকে ঘিরে। গত কয়েক মৌসুমে বসুন্ধরা কিংস ও ঢাকা আবাহনী এএফসি প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে ঘরোয়া ফুটবল স্থগিত রাখা হয়েছে। এবার ফর্টিজ এফসি ১৭ থেকে ২৩ অক্টোবর কুয়েতে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে খেলবে। কিন্তু সেই সময় ঘরোয়া ফুটবল চালিয়ে যেতে চায় বাফুফে। ফেডারেশন কাপ ও লিগের প্রথম পর্বের ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ফর্টিজের এএফসি ম্যাচগুলো আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার সঙ্গে একমত নয় ফর্টিজ কর্তৃপক্ষ। ঘরোয়া ফুটবলের প্রধান ভেন্যু জাতীয় স্টেডিয়াম নিয়েও ক্লাবগুলোর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সংস্কার শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবল সেখানে ফিরলেও ঘরোয়া ফুটবলের ম্যাচ আয়োজনের ক্ষেত্রে এখনো স্টেডিয়ামটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। ঢাকা মোহামেডান তাদের হোম ম্যাচ জাতীয় স্টেডিয়ামে আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। তবে নতুন সূচি অনুযায়ী লিগের ম্যাচ সেখানে আয়োজনের পরিকল্পনা নেই। নভেম্বরে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ হওয়ার পর ফেডারেশন কাপের কিছু ম্যাচ জাতীয় স্টেডিয়ামে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেখানে শীর্ষ ছয়ে থাকা দলগুলোর মধ্যে সীমিতসংখ্যক ম্যাচ আয়োজন করা হবে। ঘরোয়া ফুটবলের সূচি অক্টোবর থেকে শুরু করার অনুরোধ জানিয়ে এরই মধ্যে কয়েকটি ক্লাব বাফুফেকে চিঠি দিয়েছিল। ক্লাবগুলোর সেই প্রস্তাব আমলে না নিয়ে সেপ্টেম্বরেই লিগ ও ফেডারেশন কাপ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জাতীয় দলের সূচির সঙ্গে ঘরোয়া ফুটবলের সংঘাত আরও বাড়ল। আগামীকাল বাফুফের নির্বাহী কমিটির সভা হওয়ার কথা। সেখানে ঘরোয়া ফুটবলের সূচি, ক্লাব লাইসেন্সিং, জাতীয় দলের ক্যাম্প ও এএফসি প্রতিযোগিতার সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যেই সাধারণ সম্পাদকের পাঠানো চিঠি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘরোয়া ফুটবলের সূচি–সংক্রান্ত চিঠিতে সাধারণত লিগ কমিটির চেয়ারম্যান ও ফেডারেশনের সিনিয়র সহসভাপতি ইমরুল হাসানের স্বাক্ষর থাকার কথা। কিন্তু এবার চিঠিতে তাঁর স্বাক্ষর না থাকায় বাফুফের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে নতুন মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় দল, ক্লাব, খেলোয়াড় নিবন্ধন, ক্লাব লাইসেন্সিং এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সূচি—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবল আবারও সূচিজটের মুখে পড়েছে।