জাতীয় দলের হয়ে দুই দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য সাফল্যের সাক্ষী লুকা মদ্রিচ। ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং ২০২২ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জনের পথে ক্রোয়েশিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার। কিন্তু শনিবার রাতে নিজের দলের এমন একটি পরাজয়ের সাক্ষী হলেন, যা তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেও নজিরবিহীন। ইংল্যান্ডের কাছে ৭-০ গোলে হারের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের কোনো ম্যাচ শেষে নিজেকে ‘লজ্জিত’ বললেন মদ্রিচ। রিজেকার ম্যাচটি ক্রোয়েশিয়ার জন্য শুধু বড় হার নয়, দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয়ও। এর আগে ২০১৮ সালে নেশন্স লিগেই স্পেনের কাছে ৬-০ গোলে হেরেছিল ক্রোয়েশিয়া। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেল ইংল্যান্ড। ম্যাচে প্রথমার্ধেই চার গোল করে কার্যত জয় নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে আরও তিন গোল করে ৭-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে থমাস টুখেলের দল। ইংল্যান্ডের হয়ে জোড়া গোল করেন হ্যারি কেইন ও বুকায়ো সাকা। একটি করে গোল করেন অ্যান্থনি গর্ডন, জুড বেলিংহাম ও মরগান রজার্স। প্রথমার্ধেই কেইন, বেলিংহাম, গর্ডন ও সাকার গোলে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। বিরতির পর আরও দুই গোল করেন কেইন ও সাকা। শেষ দিকে রজার্সের গোলে ক্রোয়েশিয়ার লজ্জার রাত আরও দীর্ঘ হয়। মদ্রিচের জন্য ম্যাচটি ছিল জাতীয় দলের জার্সিতে ২০৫তম উপস্থিতি। ৪১ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার শুরু থেকেই মাঠে ছিলেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তাকে তুলে নেওয়া হয়। তবে ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে নিজের হতাশা লুকাননি তিনি। মদ্রিচ বলেন, ‘জাতীয় দলের সঙ্গে আমি ২০ বছর ধরে আছি। কোনো ম্যাচের পর এই প্রথমবার নিজেকে লজ্জিত মনে হচ্ছে। আমরা হারতেই পারি। আরও ভালো দলের কাছে হারাও স্বাভাবিক। ইংল্যান্ড এখন আমাদের চেয়ে ভালো দল। কিন্তু এভাবে হেরে যাওয়া এবং বছরের পর বছর ধরে যে সুনাম আমরা গড়ে তুলেছি, তা নষ্ট করা মেনে নেওয়া যায় না।’ ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক দলের পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হিসেবে লড়াই, আগ্রাসন ও দলীয় ঐক্যের অভাবকে দেখেছেন। তার ভাষায়, মাঠে দ্বৈরথে লড়াই ছিল না, আগ্রাসন ছিল না, দলের মধ্যে সমন্বয়ও ছিল না। এমন পারফরম্যান্সকে তিনি ‘বিপর্যয়কর রাত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এ জন্য কোনো খেলোয়াড়কে এককভাবে দায়ী করতে রাজি নন মদ্রিচ। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়েই ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে স্পেনের কাছেও বড় ব্যবধানে হেরেছিল ক্রোয়েশিয়া। সেই ম্যাচে ৪-১ গোলে জয় পায় স্পেন। ফলে আন্তর্জাতিক বিরতিতে টানা দুই ম্যাচে ১১ গোল হজম করল ক্রোয়েশিয়া। সামনে আবার স্পেনের বিপক্ষেই মাঠে নামতে হবে তাদের। এবার ম্যাচটি হবে স্প্লিটে। দলের এমন অবস্থায় কোচ স্লাভেন বিলিচও দায় এড়াননি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর তিনি বলেন, এমন পারফরম্যান্সের কোনো একক কারণ খুঁজে বের করা কঠিন। দলের ব্যর্থতাকে তিনি ‘সম্মিলিত ব্ল্যাকআউট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সমস্যা ছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি এবং সেসবের দায় নিজের ওপর নেন। বিলিচ বলেন, ‘এরকম একটি ম্যাচের পর কোনো যুক্তিসঙ্গত বা ইতিবাচক কথা বলা কঠিন। আমরা হতাশ। আমি হতাশ এবং আমরা সবাই দুঃখিত। মাঠে থাকা খেলোয়াড়দের জন্য, সমর্থকদের জন্য এবং পুরো দলের জন্যই খারাপ লাগছে।’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয়ের পর ক্রোয়েশিয়া এখন নেশন্স লিগের পরবর্তী ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হবে। মদ্রিচের কাছে সেই ম্যাচটি শুধু ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নয়, ৭-০ ব্যবধানে হারের পর নিজেদের পরিচয় ও লড়াইয়ের মানসিকতা ফিরিয়ে আনার পরীক্ষাও। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তিনি সতীর্থদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ব ফুটবলে ক্রোয়েশিয়ার যে মর্যাদা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে মদ্রিচদের প্রজন্মের অবদান সবচেয়ে বেশি। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং ২০২২ সালে তৃতীয় স্থান অর্জনের মতো সাফল্যের পর দেশটির ফুটবল এখন নতুন প্রজন্মের হাতে। সেই পরিবর্তনের সময়েই ইংল্যান্ডের কাছে ৭-০ ব্যবধানে হার ক্রোয়েশিয়ার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। আর মদ্রিচের ২০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই হার রেখে গেল এমন এক রাতের স্মৃতি, যেটিকে তিনি নিজেই বলেছেন—প্রথমবারের মতো ‘লজ্জার’।