প্রকাশ :: ... | ... | ...

৯-২ গোলে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ, ফাইনালে ইন্দোনেশিয়া


সংযুক্ত ছবি

ফিফা আসিয়ান কাপের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের শেষটা হলো বড় হতাশায়। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধেই ছয় গোল হজম করে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় লাল-সবুজের দল। দ্বিতীয়ার্ধে দীর্ঘ সময় নিজেদের গুছিয়ে রাখলেও শেষ মুহূর্তে আরও তিন গোল হজম করে বড় ব্যবধানের হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে। অন্যদিকে এই বড় জয় শুধু ইন্দোনেশিয়ার জন্য তিন পয়েন্টের নয়, ফাইনালের টিকিটও নিশ্চিত করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া—দুই দলই গ্রুপ পর্ব শেষে সাত পয়েন্ট করে সংগ্রহ করে। গোল ব্যবধানও ছিল সমান। শেষ পর্যন্ত বেশি গোল করার কারণে গ্রুপের শীর্ষে উঠে ফাইনালে জায়গা করে নেয় ইন্দোনেশিয়া। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার জয়ের মূল নায়ক মিচেল লি বেকার। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া এই ফরোয়ার্ড একাই করেন পাঁচ গোল। ১১ ও ২০ মিনিটে দুই গোল করে শুরুতেই বাংলাদেশের রক্ষণে চাপ তৈরি করেন তিনি। ৩২ মিনিটে রিজকি রিদোর গোলে ইন্দোনেশিয়া ৩-০ এগিয়ে যায়। এরপর ৩৬ মিনিটে বাংলাদেশের হয়ে এবারের আসরের প্রথম গোলটি করেন শাহরিয়ার ইমন। শুঁকির নিচু ক্রস থেকে হেডে গোল করেন তিনি। কিন্তু এক মিনিট পরই আবার বেকারের গোল। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে আরও একবার গোল করেন তিনি। যোগ করা সময়ে জাস্টিন হাবনারের গোলে ৬-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের এই ছয় গোলই ম্যাচের চিত্র অনেকটা স্পষ্ট করে দেয়। ইন্দোনেশিয়ার দ্রুত পাসিং, আক্রমণে একাধিক খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ এবং বক্সের ভেতরে জায়গা তৈরি করার ক্ষমতার বিপরীতে বাংলাদেশের রক্ষণ বারবার অবস্থান হারিয়েছে। বিশেষ করে দুই উইং ও মাঝমাঠের মধ্যবর্তী জায়গায় ইন্দোনেশিয়া যে ফাঁকগুলো তৈরি করেছে, সেগুলো বন্ধ করতে পারেনি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলির জন্য ম্যাচের আগেই অবশ্য এই ব্যবধানের আশঙ্কা ছিল। ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে কত গোলের ব্যবধানে হার হতে পারে—চার, পাঁচ কিংবা ছয়—তা তিনি জানেন না। দুই দলের খেলোয়াড়ের গভীরতা ও মানের পার্থক্য নিয়েও তিনি কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের রয়েছে বিপুলসংখ্যক সমর্থক, কিন্তু খেলোয়াড়ের পরিধি সীমিত; বিপরীতে ইন্দোনেশিয়ার খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি এবং তাদের অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলছেন। ম্যাচ শেষে ডুলির মূল্যায়নেও উঠে আসে দুই দলের ব্যবধানের বিষয়টি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ‘ভিন্ন মাত্রার ফুটবল’ দেখেছে। ইন্দোনেশিয়ার শারীরিক সক্ষমতা, টেকনিক্যাল মান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তাঁর মতে, বাংলাদেশ নিজেদের প্রেসিং পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি এবং ইন্দোনেশিয়াকে মাঝমাঠে সমন্বয় করে খেলার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জায়গা দিয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ কিছুটা প্রতিরোধ গড়তে পেরেছে এবং এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগানো প্রয়োজন। দ্বিতীয়ার্ধে সেই পরিবর্তনের কিছুটা দেখা যায়। বাংলাদেশ তিনটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামে এবং নিজেদের রক্ষণাত্মক কাঠামো কিছুটা শক্ত করে। প্রথমার্ধের তুলনায় ইন্দোনেশিয়ার আক্রমণ সামলাতেও সফল হয় তারা। দীর্ঘ সময় কোনো গোল না খেয়ে কাটানোর পর ৯০ মিনিটে লুক ভিকারি ইন্দোনেশিয়ার সপ্তম গোল করেন। এক মিনিট পর রাকিব হোসেনের ক্রস থেকে ফারহান আলী ওয়াহিদ বাংলাদেশের দ্বিতীয় গোলটি করেন। কিন্তু ম্যাচ তখনও শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ে কেভিন ডিকস গোল করেন। এরপর ৯০+৭ মিনিটে নিজের পঞ্চম গোল করে ইন্দোনেশিয়ার জয় ৯-২ করেন বেকার। এখানেই ম্যাচটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। ৬-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও ইন্দোনেশিয়া শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আক্রমণ চালিয়ে গেছে। কারণ একই সময়ে চলা মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর ম্যাচের ফল তাদের ফাইনালে ওঠার সমীকরণে সরাসরি প্রভাব ফেলছিল। মালয়েশিয়া শেষ পর্যন্ত ৬-০ গোলে জিতলেও ইন্দোনেশিয়ার নয় গোল তাদের গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে। ইন্দোনেশিয়ার কোচ জন হার্ডম্যান ম্যাচের পর বিশেষভাবে শেষ কয়েক মিনিটের মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করেন। তাঁর দল যখন ৭-২ ব্যবধানে এগিয়ে, তখনও তিনটি গোলের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। হার্ডম্যান জানান, দুই মিনিট যোগ করার প্রাথমিক ঘোষণা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছিল। পরে অতিরিক্ত সময় বেড়ে যাওয়ার পর তাঁর খেলোয়াড়েরা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দ্রুত তিন গোল করে। তাঁর ভাষায়, কঠিন মুহূর্তে খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া ছিল অসাধারণ। হার্ডম্যানের বক্তব্যের তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচটি শুধু ইন্দোনেশিয়ার আক্রমণাত্মক শক্তির প্রমাণ নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী ফলের ব্যবধান বাড়ানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই তীব্রতা ধরে রাখার সক্ষমতারও উদাহরণ। ইন্দোনেশিয়া যখন বুঝতে পারে যে ফাইনালে যেতে গোলের ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন তারা আক্রমণের গতি বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে পারেনি। বাংলাদেশের জন্য অবশ্য এই আসরের ফলাফল শুধু ৯-২-এর হার দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তিন ম্যাচে কোনো পয়েন্ট না পেলেও প্রতিটি ম্যাচ থেকেই কিছু শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ এবং সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ হারের পর ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে প্রথমার্ধে ছয় গোল হজম করা বড় দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে দ্বিতীয়ার্ধে দীর্ঘ সময় গোল না খাওয়া এবং শেষদিকে দুটি গোল করা দেখিয়েছে, দলটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নভেম্বরের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ডুলি আগেই বলেছিলেন, আসিয়ান কাপকে তিনি শেখার মঞ্চ হিসেবে দেখছেন এবং দেশে ফিরে সাফে ভালো করার প্রস্তুতি নিতে চান। তাই ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ৯-২ ব্যবধানের হারকে একদিকে যেমন বাংলাদেশের রক্ষণ, খেলোয়াড়ের গভীরতা ও উচ্চগতির ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সীমাবদ্ধতার স্পষ্ট চিত্র হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে দ্বিতীয়ার্ধের প্রতিরোধকে উন্নতির সম্ভাবনার একটি দিক হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু বড় দলের বিপক্ষে অভিজ্ঞতা অর্জন নয়, দেশীয় ফুটবলে নিয়মিত উচ্চমানের প্রতিযোগিতা, পর্যাপ্ত খেলোয়াড় তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচ প্রস্তুতিও জরুরি। বাংলাদেশের আসিয়ান কাপ অভিযান শেষ হয়েছে শূন্য পয়েন্টে। ইন্দোনেশিয়া সেখানে সাত পয়েন্ট নিয়ে ফাইনালে। দুই দলের পার্থক্য শুধু ৯-২-এর স্কোরলাইনে নয়; খেলোয়াড়ের সংখ্যা, গতি, শারীরিক সক্ষমতা, টেকনিক্যাল দক্ষতা, ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদল এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলের জন্য লড়াই করার সক্ষমতার মধ্যেও সেই ব্যবধান স্পষ্ট হয়েছে।