কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে সৃষ্ট আগুন চার দিন ধরে জ্বলছে। আগুনের উৎসস্থল ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন। তবে উদ্বেগের মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সেখানে গ্যাসক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা। এমনকি ভূগর্ভে তেলের উপস্থিতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সবকিছু অনুকূলে থাকলে ইনানী হতে পারে দেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)-এর উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে বাপেক্সের ভূতত্ত্ব বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির জানান, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এখানে গ্যাসক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তিনি জানান, আগামী ১৫ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে গ্যাসের নির্গমন ও আগুনের তীব্রতা না কমলে উপযুক্ত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে গ্যাস নির্গমনের পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শামসিয়া মুকতাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তি ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়েই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আপাতত বাইরের কোনো সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ সময় উপস্থিত পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, রাতে আগুনের শিখার রং পর্যবেক্ষণ করতে তাঁরা ঘটনাস্থলে এসেছেন। আগুনের শিখায় কালচে ভাব থাকায় সেখানে তেলের উপস্থিতির সম্ভাবনাও রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এদিকে গ্যাস নির্গমন ও আগুনের উৎসস্থলকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করেছে উপজেলা প্রশাসন। আগুনের উৎসস্থল ও আশপাশের ২০০ মিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের স্বাক্ষরিত আদেশে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা কার্যকর থাকবে। নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দেশলাই ও লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানান, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে মেরিন ড্রাইভ থেকে ইনানী ও কোটবাজারে যাতায়াতের দুটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সড়কে কাঁটাতারের ব্যারিকেড স্থাপন করেছে। গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাতটার দিকে ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ খননের সময় হঠাৎ ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়। প্রথম দিকে আগুনের তীব্রতা কম থাকলেও বিকেল পাঁচটার পর তা বাড়তে থাকে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। চার দিন ধরে অব্যাহতভাবে জ্বলতে থাকা এই আগুন এখন জাতীয় পর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে নতুন জ্বালানি সম্পদের সন্ধান দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইনানী। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাসক্ষেত্র ও তেলের সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও সেখানে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ গ্যাস বা তেলের মজুত রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন হবে ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা, কারিগরি মূল্যায়ন ও পরবর্তী অনুসন্ধান।