প্রকাশ :: ... | ... | ...

অগ্রণী ব্যাংকের ভল্টে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি, গ্রেপ্তার ২


সংযুক্ত ছবি

এজাহারে অর্থ সরিয়ে গরুর খামারে বিনিয়োগের তথ্য, জব্দ দুই মোবাইল ও ৬৪ জিবির পেনড্রাইভ চট্টগ্রাম: অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চট্টগ্রামের লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার ক্যাশ ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীর নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার এজাহার ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ভল্টে সংরক্ষিত নগদ টাকার হিসাব মেলাতে গিয়ে বিপুল অঙ্কের এই ঘাটতি ধরা পড়ে। অভিযোগের তদন্তে অর্থ সরিয়ে হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত এগ্রো’ নামে একটি গরুর খামারে বিনিয়োগের তথ্যও সামনে এসেছে। বর্তমানে ওই খামারে বিভিন্ন জাতের ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশ বলছে, পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন এবং অর্থের গতিপথ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, কামরুল হোসেন অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার ক্যাশ ও ভল্টের দায়িত্বে ছিলেন। ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব মেলানোর সময় গরমিল দেখা যায়। পরে ভল্টের হিসাব, সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র ও নথি যাচাই করা হয়। এতে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা কম পাওয়া যায়। এজাহারে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি ঘাটতির বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মামলার এজাহারে কামরুল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার একটি কৌশলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ভল্টে টাকা জমা দেওয়ার সময় ১ হাজার টাকার নোটের বড় বান্ডিলের মধ্যে ১০০ টাকা বা তার কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে বান্ডিল তৈরি করা হতো। ফলে বাইরে থেকে বান্ডিল দেখে মনে হতো সেখানে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থের পরিমাণ থাকত কম। এই পদ্ধতিতে ভল্টে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ কাগজপত্র বা বান্ডিলের হিসাবে বেশি দেখানো হলেও প্রকৃত অর্থ কম থাকার সুযোগ তৈরি হয় বলে মামলার নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন—কতদিন ধরে এভাবে অর্থের ঘাটতি তৈরি করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় আরও কেউ জড়িত ছিলেন কি না। মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, ভল্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ দিয়ে হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত এগ্রো’ নামে একটি গরুর খামারের কার্যক্রম শুরু করার অভিযোগ। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, জাফরুল্লাহ তানভীরের দেখাশোনার শর্তে ওই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। বর্তমানে খামারটিতে বিভিন্ন জাতের ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে। এখন তদন্তের অন্যতম বিষয় হলো—খামারটি পরিচালনায় কী পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেই অর্থের উৎস কী এবং ব্যাংকের ভল্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থের সঙ্গে খামারের বিনিয়োগের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না। এ ঘটনায় ব্যাংকের পক্ষ থেকে করা মামলায় কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। কামরুল হোসেন ওই শাখার সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ। আর জাফরুল্লাহ তানভীরও মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠালে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার দুজনের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের তথ্য এবং বিভিন্ন তথ্যের স্ক্রিন রেকর্ডসহ একটি ৬৪ জিবির পেনড্রাইভও জব্দ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা এসব ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখছেন। অর্থ সরানোর পরিকল্পনা, লেনদেন, যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে এসব ডিভাইস থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভল্ট থেকে কয়েক কোটি টাকা ঘাটতির ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি ব্যাংকের ভল্টে থাকা নগদ অর্থ নিয়মিত হিসাব, রেকর্ড ও যাচাইয়ের আওতায় থাকার কথা। সেখানে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি কীভাবে তৈরি হলো এবং তা আগে কেন শনাক্ত করা যায়নি—তদন্তে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বান্ডিলের ভেতরে কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে অর্থের পরিমাণ কমিয়ে রাখার যে অভিযোগ এজাহারে এসেছে, সেটি সত্য হলে ব্যাংকের নগদ অর্থ যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোথায় ঘাটতি ছিল, তা নির্ধারণ করা জরুরি। তদন্তে এ বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত মামলার তথ্য অনুযায়ী, ৯ আগস্ট হিসাব মেলানোর সময় প্রথম বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে। তবে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার এই ঘাটতি একদিনে তৈরি হয়েছে, নাকি দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে অর্থ সরানো হয়েছে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদি দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ সরানো হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট হিসাব, ভল্ট রেকর্ড, ক্যাশ লেনদেন, টাকা জমা ও উত্তোলনের নথি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট ও নজরদারির কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও সামনে আসতে পারে। মামলায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। ফলে পুলিশের তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রেপ্তার দুজনের বাইরে আরও কেউ এই ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না। পুলিশের হাতে থাকা মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপের যোগাযোগ, স্ক্রিন রেকর্ড ও পেনড্রাইভের তথ্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। এ ছাড়া ‘ইশরাত এগ্রো’র মালিকানা, বিনিয়োগের উৎস, জমি বা খামার পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং গরু কেনার অর্থের উৎসও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অর্থের প্রকৃত গতিপথ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে। আপাতত পুলিশ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া ডিজিটাল আলামতসহ অন্যান্য নথি পরীক্ষা করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কয়েক কোটি টাকা ঘাটতির অভিযোগের পাশাপাশি অর্থের সম্ভাব্য ব্যবহার ও ব্যাংকের ভেতরের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা—দুই দিক থেকেই তদন্ত এগোতে পারে।