৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চট্টগ্রামে প্রবাসীর বাড়িতে দুই রাউন্ড গুলি, বিদ্যুৎ ছিল না—নষ্ট সিসিটিভি; আতঙ্কে পরিবার চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির পর এক প্রবাসীর বাড়ির গেটে গুলি চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ওই প্রবাসীকে এক ঘণ্টার মধ্যে চাঁদার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের রাস্তাঘাটে গুলি করার হুমকিও দেওয়া হয়। সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর হামজারবাগ লেনের ৫ নম্বর রোডে রুনা টাওয়ারের বাসভবন লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। ভবনের মূল গেটে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাটিও নষ্ট ছিল। ফলে হামলাকারীদের শনাক্ত করা নিয়ে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর জোনের উপকমিশনার হাসান মোস্তফা স্বপন ঘটনার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ‘৫০ লাখ টাকা দিতে হবে’ রুনা টাওয়ারের মালিক হাজী ইউসুফের ছেলে মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী মো. শওকতকে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। প্রায় দুই মিনিটের ওই ভয়েস মেসেজে শওকতের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ করে তাকে ভয় দেখানো হয়। বলা হয়, পরিবারের সদস্যদের কোথায় বিয়ে হয়েছে, কোথায় ভবন রয়েছে, সন্তানরা কোথায় পড়াশোনা করে—এসব তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। এরপর চাঁদার টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়। ভয়েস মেসেজে বলা হয়, “এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাই দেবে। এক ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত না জানালে আর যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা না দাও রাস্তাঘাটে তোমার বাবা, ভাই আর ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ঘটনা হবে।” এরপর আরও কঠোর হুমকি দেওয়া হয়। মেসেজে বলা হয়, “এক ঘণ্টা পর আর ফোন করব না। ছেলেদেরকে বলব গুলি করতে। এবার যার গায়ে লাগুক, যেখানে লাগুক।” আরেকটি ভয়েস মেসেজে চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়ে এক কোটি টাকা করার হুমকিও দেওয়া হয়। হুমকির পরদিনই গুলি পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হুমকির একদিন পর সোমবার রাতে দুই যুবক রুনা টাওয়ারের নিচে যায়। তাদের বয়স আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ বছর। তারা প্রথমে দারোয়ানের কাছে বাড়ির মালিকের কথা জানতে চায়। এরপর ভবনের গেট লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি ছুড়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। পুলিশের ধারণা, গুলিগুলো পিস্তল থেকে ছোড়া হয়েছে। ডিসি হাসান মোস্তফা বলেন, হামলাকারীরা গুলি ছোড়ার পর হেঁটে গলি দিয়ে বের হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছে এবং কারা এর পেছনে রয়েছে তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ‘বড় সাজ্জাদ গ্রুপের মতোই কায়দা’ ঘটনার ধরন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হুমকির কৌশলটি চট্টগ্রামের পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ইন্টারপোলের ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিল রয়েছে। ডিসি হাসান মোস্তফা বলেন, “আগের বড় সাজ্জাদ গ্রুপের মতোই একই কায়দায় হুমকি এসেছে, ধরন একই। বিদেশি নম্বরের মতো মনে হয়েছে। তবে আমরা বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে চাই।” তিনি জানান, প্রবাসীর পরিবারকে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে। ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পরই নতুন আতঙ্ক চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচিত বড় সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গত ৩০ জুলাই ভারতে পালানোর সময় গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত ১৩ জুলাই বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের কার্যালয়ে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, এর আগে প্রতিষ্ঠানটির মালিককে ফোন করে এককালীন এক কোটি টাকা এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন ডেভিড ইমন। ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের পরও বড় সাজ্জাদ গ্রুপের অনেক সদস্য পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছিল পুলিশ। চট্টগ্রামের এসপি মাসুদ আলম তখন জানিয়েছিলেন, গ্রুপটির অন্যতম শুটার রায়হান আলমসহ কয়েকজন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আগেও ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে হামলা চাঁদা দাবির পর গুলি চালানোর ঘটনা চট্টগ্রামে নতুন নয়। গত ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের বাড়িতে দুই দফা হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। সেই ঘটনাতেও বড় সাজ্জাদের নাম আলোচনায় আসে। এবার মুরাদপুরে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য জানিয়ে হুমকি এবং পরদিনই বাড়ির গেটে গুলি—সব মিলিয়ে নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে **বিদ্যুৎ না থাকা এবং বাড়ির সিসিটিভি নষ্ট থাকার সুযোগে হামলা** চালানোয় দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা তথ্য সংগ্রহ করেছিল, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুলিশ বলছে, কারা এই হুমকি দিয়েছে এবং গুলি চালানোর সঙ্গে তাদেরই সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে ভয়েস মেসেজের হুমকির পরই বাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় মুরাদপুর এলাকায় এখনো আতঙ্ক কাটেনি।