প্রকাশ :: ... | ... | ...

কী নিয়ে বাজেট পরিকল্পনা করছে সরকার?


সংযুক্ত ছবি

বছর কয়েক ধরে দেশের অর্থনীতি যেসব সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সেগুলো কাটেনি বরং আরও বেড়েছে। এরমধ্যেই নির্বাচন ঘিরে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতি জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল সেগুলো আগামী বাজেটে বাস্তবায়নের ছাপ থাকার চাপ থাকছে অর্থমন্ত্রীর ওপর। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে তিনি কতটুকু কী করতে পারবেন দেখার বিষয় এখন সেটিই। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে পরিকল্পনার ছক কষতে গিয়ে তিনি কি আগের সরকারগুলোর মত গতানুগতিক পথে হাঁটবেন নাকি ভিন্ন কিছু করবেন? এমন প্রশ্নও সামনে এসেছে। বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প না থাকার তথ্য মিলছে। অর্থনীতির দোদুল্যমানতার মধ্যে অর্থমন্ত্রীর হাতে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যে তিনি নতুন কিছু করে ফেলবেন; চমক দেখানোর বাজেট দেবেন। বরং জাতীয় বাজেট করতে গিয়ে তার হাতে ‘না থাকা’ এর তালিকাই লম্বা। পেছনের সংকটের বোঝা টানতে গিয়ে সরকারের সামনের পথটা জটিল। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির নির্বাচিত নতুন সরকারের শুরুটাও হয়েছে অর্থনীতিতে বৈশ্বিক চাপের বোঝা নিয়ে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে অর্থনীতির ওপরে ভাসতে থাকা কালো মেঘ কেটে যাবে বলে দেড় বছর বয়সি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিক থেকে যে কথা বলা হচ্ছিল তা শুরুতেই হোঁচট খায় ইরান যুদ্ধের কারণে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নীতি নির্ধারণী ব্যক্তি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের কাছে বাজেটের আগে সরকারের হাতে কী আছে কি নেই- জানতে চাইলে তারা, ‘না’ এর ফর্দটা দীর্ঘ বলে তুলে ধরেন। তারা বলছেন, অর্থনীতিতে সংকট এখন নানামুখী। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকটময় অর্থনীতি এখন আরও চাপে পড়েছে ইরান ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও। সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি। চোখ রাঙাচ্ছে বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির শঙ্কা। চড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির জন্য তা আরও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাজেট নিয়ে সরকারের করণীয় বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশে কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলছেন, “সাশ্রয়ী হওয়াটা এখন কোনো বিকল্প না, এটা এখন বাধ্যবাধকতা।” বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এখন মূল কথা হল- অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং মানুষের এই দরিদ্র মানুষের কষ্টটা যাতে আর না বাড়ে, এমনিতে তারা কষ্টে আছে, থাকত সব সময়, এইটা যাতে আর বৃদ্ধি না পায় সে ব্যবস্থা নেওয়া।” এমন প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আদায়ের পুরনো সমস্যার সুরাহা না করে বড় লক্ষ্য ধরে বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি নির্ধারণের আলোচনা চলছে। সরকারের হাতে কী আছে, কী নেই? বড় বাজেট উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চাকাঙ্খা, সদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতির দেখা মিললেও বর্তমানে পর্যাপ্ত টাকা না থাকাকেই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে দেশি উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরামর্শ তার। তিনি বলেন, “এটাতো একদিনের ব্যাপার না এবং সংস্কার ছাড়া আসলে পুরোপুরি রাজস্ব আহরণ বাড়বে না। কিন্তু সংস্কার প্রক্রিয়াটা আবার খুব দ্রুত করা যায় না। তো স্বল্পমেয়াদে এক বছরের মধ্যে যেটা- সংস্কারটা শুরু করা, ইনস্টিটিউশনকে শক্তিশালী, সেটা করা আগামী অর্থবছরেই।” এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর গুরু দায়িত্বও রয়েছে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায়। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জেরবার মানুষের জীবনযাত্রা। ইরান যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম বাড়তে থাকার মধ্যে এপ্রিল শেষে তা আবার ৯ শতাংশে গিয়ে উঠেছে। এমন অবস্থায় সরকার অর্থ ছাপিয়ে বাজেট চাহিদা মেটানোর পুরনো পথে হাঁটলে মূল্যস্ফীতির পারদ আরও লাগামহীন হয়ে উঠবে কিনা সেই শঙ্কা রয়েছে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মাঝে। সরকারের আলোচনাতেও এসব সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার বার্তা মিলেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, ব্যাংক থেকে টাকা নেওয়া কিংবা টাকা ছাপিয়ে বাজেট অর্থায়নে তার সরকার ‘অত্যন্ত সতর্ক’ থাকবে। বারবার একই করদাতাদের উপরে চাপ প্রয়োগ না করে তিনি আবারও কর জাল বাড়ানোর তাগিদ দেন। সরকারের ব্যয় মেটাতে শুধু অর্থের সংস্থানের অভাব নয়, অর্থনীতির প্রধান সব সূচকই বেশ কিছু দিন থেকে নিম্নমুখী। মূল্যস্ফীতি, তার‌ল্য সংকট, সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বিনিয়োগে খরা, কর্মসংস্থানে ভাটা, ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি ভোগাচ্ছে সরকারকে। এনবিআর চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ৯৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখেছে। অর্থবছরের শেষ নাগাদ চার লাখ কোটি টাকা আহরণের নজির স্থাপন করতে পারবে কিনা সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থায়নের আরেক উৎস বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতেও দেখা গিয়েছে ধীর গতি। আইএমএফ চলমান ঋণ কর্মসূচির অর্থছাড় থামিয়ে দিয়েছে। নতুন শর্তের বেড়াজালে কীভাবে আইএমএফের ঋণ মিলবে সেটির সুরাহাও হয়নি। সেক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় কম হলে বাজেট বাস্তবায়নে কী ব্যাংক খাতের ওপর ভর করবে সরকার? সরকার বেশি বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের কী হবে? অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে আশার আলো নেই। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদহারের সীমা যেখানে রাখা হয়েছে তাতে বিনিয়োগের গেরো সহসা কাটবে এমনটা মনে করছেন না ব্যবসায়ীরা। তবে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটের আকার ‘বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই’ বলে তার ভাষ্য। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের চিন্তায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ার প্রতিফলন এ বাজেটেই দেখা মিলবে বলেও তার পরিকল্পনার তুলে ধরেন। বাজেট ঘিরে পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সম্ভাব্য তারিখ ১১ জুন ধরে প্রস্তুতি এগোচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। রীতি মেনে বৃহস্পতিবারই নির্ধারণ করা হয়েছে বাজেট পেশের দিন। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা যাচ্ছে তাতে ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার আকার ধরে বাজেট পরিকল্পনার ছক কষছে অর্থ বিভাগ। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরে তিন লাখ কোটি টাকা করা, নির্বাচনে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৩ হাজার কোটি টাকা, সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি চাকুরেদের নতুন বেতনকাঠামোর কিছুটা বাস্তবায়নে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা ধরে এগোচ্ছে সরকার। চলতি অর্থবছরে সুদ পরিশোধে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকটে বাড়তি দামে যে তেল ও গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে সেটির সংস্থানের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে সরকারকে। অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, “বাজেটের আকার বড় হয়ে যাচ্ছে, মূলস্ফীতি নিয়ে কী হবে? আসলে গত তিন বছর ধরে সংকোচনমূলক বাজেট করছি। এবং এটার একটা বড় সমস্যা হলো যে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের নীতি নিলে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা কাঠামোগত দুর্বলতা দেখা দেয়। এবং প্রবৃদ্ধিটা আবার নিম্নগতির দিকে আসার সম্ভাবনা থাকে। এই এটা একটা বড় চিন্তা আমাদের মাথায় আছে। দ্বিতীয় বিষয়টা হলো যে- সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার।” তার ভাষ্য, মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর জন্য ‘টার্গেটেড সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রাম’ নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলেন। এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে যারা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বেশি চাপে পড়েছে তাদের সহায়তা করা হবে। স্বাস্থ্য-শিক্ষায় জিডিপির বিচারে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি মূলধনি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। বলেন, “শিল্পের ক্ষেত্রে যে অন্য আনুষঙ্গিক পরিবেশের অভাব আছে যার জন্য বেসরকারি খাতে অর্থায়ন কমে যাচ্ছে, সেটাও দূর হবে না। এই সার্বিক চিন্তা থেকেই বাজেটকে বড় করছি।” বাজেটের আকার বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধির ট্রেনে আবার সরকারের উঠে পড়ার চিন্তাভাবনার বিষয়টির আভাস পাওয়া যায় তার বক্তব্যে। বিনিয়োগকে গতিশীল করতেও তা ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সরকারের ব্যয় বাড়াতে গিয়ে টাকা ছাপানো হবে না বলে সরকারের অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু। বলেন, “টাকা ছাপানো, হাই পাওয়ার মানি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদের যে বড় বড় ঋণ- এটা এড়িয়ে চলা আমাদের এক নম্বর অগ্রাধিকার। আমরা চেষ্টা করছি। আর বাজেটের কথা বলছেন সাইজ- আপনি যদি দেশের প্রবৃদ্ধি চান, আপনি যদি বিনিয়োগ চান আপনাকে তো বাজেট বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। বাজেট বাড়ানো ছাড়া দেশেরতো প্রবৃদ্ধি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যেতো বাজেট দিতে হবে। শিক্ষায় বাজেট দিতে হবে। আপনি যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের কথা সবসময় বলে আসছেন- কোনো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সফল করতে হলে সবার আগে বিনিয়োগ করতে হবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়।” সরকারের সামর্থ্য কতটা? উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সরকারকে তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে দেখা গেছে। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড দেওয়া, কৃষি ঋণ মওকুফের পদক্ষেপ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। আরও বেশ কিছু প্রণোদনা দিচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনী বাড়ানোর কথাও আসছে। এসব পদক্ষেপে প্রান্তিক মানুষের উপকার হলেও এগুলো মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। আবার এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থের দরকার। কিন্তু অর্থের জোগানই এখন বাজেট বাস্তবায়ন ও নতুন বাজেট করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় সমস্যা আকারে হাজির হচ্ছে এবারও। অর্থের জোগান পরিকল্পনায় সেই এনবিআরের ওপরই ভরসা করছে সরকার। আগামী অর্থবছরের জন্য মোট রাজস্ব আদায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার মত করার আলোচনা চলছে। এরমধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার মত। বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের নয় মাস শেষে বিশাল ঘাটতির পরও যদি এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় করতে সক্ষম হয় তাহলে আগামী অর্থবছরে কর আদায়কারী এ সংস্থার ওই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে। এটি আদতে সম্ভব না। সাশ্রয়-সংস্কারের তাগিদ বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজেট পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রথমেই সাশ্রয়ের দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দিয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “সাশ্রয়ী হওয়াটা এখন কোনো বিকল্প না, এটা এখন বাধ্যবাধকতা। প্রশ্নটা হল কতটা সাশ্রয়ী হব, কোন জায়গায় সাশ্রয়ী হব এবং কীভাবে সাশ্রয়ী হব।” রাজস্ব আদায় কম এবং যুদ্ধের আগের আগে থেকে অর্থনীতি একটা সংকটের মধ্য দিয়ে থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, জ্বালানি নিরাপত্তাতো বলার অপেক্ষা রাখে না।” বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের এই প্রধান অর্থনীতিবিদ। বলেন, “আপনার এই ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা নাই, আপনি বৈদেশিক সহায়তা পেলেও। তো, কাজেই কোথায় সেভিংসটা হবে সেটাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। সেইজন্য আবার এই সংকটের সময় যারা এই সংকটকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে না–দরিদ্র, নিম্ন আয়ের ঝুকিপূর্ণ দরিদ্রদের সরাসরি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা ছাড়াতো আমি বিকল্প দেখছি না।” সামাজিক সুরক্ষা খাতের সরকারের ব্যয় বাড়ানোর পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে তিনি বলেন, “এখন ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিটা অবশ্যই এটা সময়োপযোগী কর্মসূচি। যুদ্ধের পরেতো এটা আরো বেশি সময়োপযোগী হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিষয়টা হলো ডেলিভারি সিস্টেমটা–যে এটা যাদেরকে লক্ষ্য করে দেওয়া হচ্ছে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে কি না। এবং এটার জন্য যে অর্থায়নটা লাগবে সেই অর্থায়নে ভর্তুকি কমিয়ে এখন যে জ্বালানির দাম বাড়ানো হল- এর ফলেতো ভর্তুকির বোঝা এখন আগের চেয়ে বেশি হবে। কিন্তু না বাড়াইলে (জ্বালানির দাম) আরো বেশি হত। তো এই ধরনের পরিস্থিতিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে খুব বেশি উচ্চভিলাষী হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। এখন মূল কথা হল- অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা এবং মানুষের এই দরিদ্র মানুষের কষ্টটা যাতে আর না বাড়ে, এমনিতে তারা কষ্টে আছে, থাকত সব সময়, এইটা যাতে আর বৃদ্ধি না পায় সে ব্যবস্থা নেওয়া।” সরকারের প্রাধিকারে সংস্কার কাযক্রম এগিয়ে নেওয়ারও পরামর্শ তার। বলেন, “আপনার সংস্কার কার্যক্রম যদি আপনি এগিয়ে নিতে পারেন যেটা খরচের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। ধরেন এই যে এনবিআর থেকে এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ে শক্তিশালী করা, করদাতার ওপর চাপ না বাড়িয়ে।” তিনি এনবিআরের দক্ষতা ও সুশাসন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকিংয়ের দুর্দশা কাটানোর তাগিদ দেন। এসব খাতে সংস্কার হলে তা উন্নয়ন সহযোগী এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর অর্থায়ন পাওয়া সহজ হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব অর্থায়ন বাজেট বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে। সুতরাং বাজেটের প্রধান দরকার হল অর্থের জোগান এবং অর্থের জোগান করতে গেলে যে সংস্কারগুলো দরকার, সেই সংস্কারগুলোর দিকে বেশি মনোযোগী হওয়া। এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া, খাদ্য নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো সরকারের মূল পরিকল্পনায় থাকা জরুরি।” সূত্র : বিডিনিউজ