গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘স্যাড ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ১ কোটি টাকা দিয়েছিল বলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ বলেছেন। অনুদানের প্রায় ১ কোটি টাকার তথ্য গোপনের অভিযোগ ওঠার পর তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দিলেন। রিফাত বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ৫ কোটি টাকার ‘চুক্তি’ হলেও শেষ পর্যন্ত ‘স্যাড ফাউন্ডেশনকে’ সাত দিনের প্রচারের জন্য ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার রাতে ফেইসবুকে লাইভে এসে তিনি দাবি করেছেন, ওই অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত মেনে খরচ করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত অডিট ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষা করিয়ে প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে গণভোটের প্রচারের জন্য পাওয়া অর্থের তথ্য গোপনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পর এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিলেন সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিতে যোগ দেওয়া রিফাত রশিদ। তিনি বলেছেন, এ বিষয়টি স্পষ্ট করা দরকার বলে তার মনে হয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদেরকে ১ কোটি টাকা দিয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, সেই অভিযোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করতেছি।” দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকসহ যে কোনো তদন্তকারী সংস্থা চাইলে তিনি নিজে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেবেন, বলেছেন এই ছাত্র নেতা। রিফাত বলেন, “দুদকসহ বাংলাদেশের যেকোন ধরনের তদন্তকারী সংস্থা যদি এইটা নিয়ে আমাদেরকে বলে যে অভিযোগ করতে চায়, অভিযোগগুলোর তদন্ত করতে চায়, আমরা তাদেরকে পূর্ণ সমর্থন দেব। আমি নিজে গিয়ে তাদের অফিসের ভিতরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আসব।” গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সেড ফাউন্ডেশনকে তহবিল দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য জানার চেষ্টা করছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট হয়েছে। চুক্তি ৫ কোটির চুক্তি, পেয়েছেন ১ কোটি রিফাত বলেছেন, গণভোট নিয়ে সারাদেশে প্রচার চালাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সে পরিকল্পনায় ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’, অনলাইন প্রচার, কনসার্ট, লিফলেট, ক্যারাভ্যান এবং ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট দেওয়ার উদ্যোগ ছিল। তিনি বলেন, এ জন্য তারা তহবিল গঠনের চেষ্টা করতে করতে এক ‘বড় ভাইয়ের’ পরামর্শে বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরতে ঘুরতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যান। ক্ষেত্রের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের কিছু বড় ভাই এবং কিছু কর্মকর্তা তাদের সহায্য করেছিলেন। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে যাই, আমাদের প্রস্তাবগুলো দিই। দেওয়ার পর সেটা ‘একসেপ্ট’ হয়, বড় ফান্ড দেওয়া কথা ছিল এবং আমরা নেশন ওয়াইড বড় ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করেছিলাম,” বলেন রিফাত। সে ক্ষেত্রে প্রায় ১২ কোটি টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তুলে ধরে তিনি বলেন, সঠিক অঙ্কটা হুবহু বলতে পারছেন, মনে নেই, পরে মন্তব্যে স্পষ্ট করবেন। সে সময় কিছু জটিলতা দেখা দেওয়ার কথা তুলে ধরেন রিফাত বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সার্বজনীন প্ল্যাটফর্ম, রেজিস্ট্রেশন করলে অনেকরকম ধরা বাঁধা থাকে। অনেক বিধি-বিধানের আওতায় চলে আসে। কিন্তু তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে সেই বিধি-বিধানের আওতায় রাখাতে চান না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফর্মটির জন্ম হয়েছে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু নিবন্ধনবিহীন কোনো সংগঠনকে তহবিল দেবে না, তাই তারা ফাউন্ডেশন গঠন করেন, ‘স্যাড’ নামে একটা ফাউন্ডেশন গঠন করেন, বলেছেন এনসিপিতে যোগ দেওয়া এই ছাত্র নেতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই নেতা বলেছেন, “১৫ দিনের প্রচার পরিকল্পনা রেখে আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫ কোটি টাকা একটা চুক্তি হয়, চুক্তি সম্পাদিত হয়। তবে আসলে ভোটের আগে সময় স্বল্প ছিল, এক সপ্তাহের মতো ছিল, তো সে জায়গা থেকে আমরা সাত দিন প্রচারের জন্য, সারা বাংলাদেশে, এখানের ভিতর অনেকগুলো কাজ ছিল, প্রথম হল গিয়া জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে যাওয়া, আমাদের ক্যারাভেন ছিল, আমাদের ‘ইয়েস গেইট’ ছিল, লিফলেট ছিল, প্রচারণা ছিল, আপনারা জানেন যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রত্যেকটা কেন্দ্রে চেষ্টা করেছি এজেন্ট নিয়োগের জন্য,… তো বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদেরকে ১ কোটি টাকা দিয়েছে।” অডিট করে জমা দেওয়ার দাবি রিফাত দাবি করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজিস্টার্ডকৃত যে অডিট ফার্ম, সেই বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের যতগুলো কন্ডিশন দিয়েছে সে চুক্তিতে সেগুলো পূরণ করি।” এনসিপিতে যোগ দেওয়া এই নেতা বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজিস্টার্ডকৃত যে অডিট ফার্ম আছে, সেই অডিট ফার্মের দ্বারা অডিট করাই। আমরা এই অডিটটা আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাইয়াও দিছি।” বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এ নিয়ে কোনো সমস্যা পাননি বলেও দাবি করেন তিনি। ‘স্যাড ফাউন্ডেশনে সিনথিয়াও ছিলেন’ বৃহস্পতিবার মধুর ক্যান্টিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা, জেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাশরাফি ও সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক আতিক শাহরিয়ার সংবাদ সম্মেলনে আসেন। তারা অভিযোগ করেন, সংগঠনের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রিফাত রশিদ একাই নিয়েছেন। তবে রিফাত দাবি করছেন, তাদের ফাউন্ডেশনের সঙ্গে শুরুতে সিনথিয়া জাহীনও যুক্ত ছিলেন। তিনি শুরুতে কাগজপত্র দেন, সই করেন এবং প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরে ফাউন্ডেশন বা গণভোট প্রচারে থাকবেন না বলেছেন। তিনি বলেন, “সে হলে গিয়ে কল দিয়ে জানায় যে সে এই প্লাটফর্মের সাথে যুক্ত মানে এই ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত থাকবে না, এমনকি গণভোটের কোনো ‘ক্যাম্পেইনের’ সাথে যুক্ত থাকবে না, এই কোনো পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে না।” রিফাত দাবি করেন, আয়েশা তখন বলেন, তাকে যুক্ত করা হলে তিনি সংবাদ সম্মেলন করবেন। এরপর আয়েশাকে বাদ দিয়ে নিবন্ধন প্রক্রিয়া এগোনো হয় বলে জানান তিনি। ‘অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ গণভোটের প্রচারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৃণমূল নেতাকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন দাবি করেন সংগঠনটির সভাপতি বল্নে, “আমাদের যেহেতু সারাদেশে নেতাকর্মীরা রয়েছে। তো তাদেরকে আমরা একটা ‘টাস্ক’ দিব, তারা যাতে বাংলাদেশের ‘রুট লেভেলে’ গিয়ে যাতে বোঝায় গণভোট কি, কেন জরুরি, কেন এই গণভোটের হ্যাঁ দেওয়া জরুরি।” তার দাবি, গণভোটে জয়ের বড় অংশের কৃতিত্ব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৃণমূল নেতাকর্মীদের। অর্থ তছরুপের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “কোটি টাকার অর্থ তছরুপ জিনিসটা হাস্যকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই, আমি বলব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।” সংগঠনের সভাপতি বলেন, “গণভোটকে বিতর্কিত করার জন্য এই ব্যাপারগুলো, আসলে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন কিছু অভিযোগ আনা হইছে।” ‘সরকারের পকেট সংগঠন’ না হওয়ার আহ্বান রিফাত বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সবসময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তাই এই সংগঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়া কেন দরকার, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কি এমন হইছে যে যারা সরকারি দল প্রাইম মিনিস্টার বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করতে হয়।” তার দাবি, সংগঠনকে সরকারের কোর্টে ঠেলে দিয়ে ‘পকেট’ বা ‘চাটুকারিতার’ জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। রিফাত যেভাবে নেতৃত্বে এলেন সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর গঠিত হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামের প্ল্যাটফর্ম। এ আন্দোলন এক পর্যায়ে ছাত্র-গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি গড়ে ওঠে। এনসিপি গঠনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় অংশ দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়ে। এতে প্ল্যাটফর্মটির ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক অবস্থান এবং অরাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ অবস্থায় ২০২৫ সালের ২৫ জুন ঢাকার বাংলামোটরে রূপায়ণ টাওয়ারে ভোটের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক বছরের কমিটি ঘোষণা করা হয়। সেখানে সভাপতি হন রশিদুল ইসলাম, যিনি রিফাত রশিদ নামে পরিচিত। সাধারণ সম্পাদক হন মো. ইনামুল হাসান। ওই কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক হন ঢাকা কলেজের মুঈনুল ইসলাম এবং মুখপাত্র হন বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সিনথিয়া জাহীন আয়েশা। সূত্র : বিডিনিউজ