প্রকাশ :: ... | ... | ...

চাইনিজ পোশাক ব্যবসায়ীর কোটি টাকা নিয়ে উধাও ড্রাইভার, পাঠালেন খুদেবার্তা


সংযুক্ত ছবি

‘আমি দুঃখিত স্যার। আমাকে ভুলে যাবেন। আপনার গাড়ি লে ডি’ অর কফি শপের পার্কিংয়ে রেখে গেছি। আমি আপনার প্রতি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব। উপরওয়ালা জানেন, আমি জীবনে কারও বিশ্বাস ভঙ্গ করিনি। তবে আমাকে এটি করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমি জানি না, বাঁচব কি না। যদি বেঁচে থাকি আপনার টাকা ফেরত দেব।’ এক কোটি টাকা নিয়ে গাড়ি থেকে উধাও হওয়ার পর মালিকের মোবাইল ফোনে এমনই একটি খুদে বার্তা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে এক গাড়িচালকের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য গাড়িতে রাখা এক কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে চালক জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার তৈরি পোশাক কারখানা ল্যাভেন্ডার গ্রুপের চেয়ারম্যান এক চীনা নাগরিকের গাড়ি চালিয়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন জাহিদ। ওই চীনা ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত কারণে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর অভিযোগ, গাড়িতে থাকা টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর জাহিদ নিজের মোবাইল ফোন থেকেই তাঁকে ওই খুদে বার্তা পাঠান। বার্তায় চালক দাবি করেন, তিনি জীবনে কারও বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি এবং তাঁকে এমন কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, এক কোটি টাকা নিয়ে পালানোর ঘটনায় জাহিদ একাই জড়িত কি না। বিশেষ করে গাড়িতে এত বিপুল পরিমাণ টাকা থাকার বিষয়টি তিনি কীভাবে জানলেন এবং পালিয়ে যাওয়ার পর গাড়িটি কোথায় রেখে গেলেন—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। ল্যাভেন্ডার গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আকরামুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে কারখানায় দিনের কাজ শেষে চীনা ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন জাহিদ হাসান। পথে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার আওতাধীন পূর্বাচল ক্যাডেট কলেজের সামনে গাড়ি থামানো হয়। সেখানে একটি হোটেলে খাবারের জন্য তাঁরা যাত্রাবিরতি করেন। খাওয়া শেষে গাড়ির কাছে ফিরে ওই ব্যবসায়ী দেখেন, গাড়ি ও চালক—দুটিই নেই। এরপর জাহিদের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। কিছুক্ষণ পর ওই ব্যবসায়ীর ফোনে জাহিদের নম্বর থেকেই একটি খুদে বার্তা আসে। তাতে চালক গাড়ি কোথায় রেখে গেছেন, সে কথাও উল্লেখ করেন বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ঘটনার পর ল্যাভেন্ডার গ্রুপের কর্মকর্তারা প্রথমে ঢাকার গুলশান থানায় যোগাযোগ করেন। চীনা ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান। পরে মঙ্গলবার রাতেই গুলশানের আজাদ মসজিদের সামনে থেকে গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। তবে টাকা বা চালকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। গাড়িটি উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল নিয়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় করে তদন্তের বিষয়টি এগোয়। গুলশান থানা থেকে জানানো হয়, ঘটনার মূল স্থান খিলক্ষেত থানার আওতাধীন হতে পারে। পরে ল্যাভেন্ডার গ্রুপের কর্মকর্তারা খিলক্ষেত থানায় যান। সেখান থেকে তাঁদের জানানো হয়, ঘটনাস্থল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার আওতাধীন। এরপর বুধবার ল্যাভেন্ডার গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আকরামুল ইসলাম বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে গাড়িচালক জাহিদ হাসানকে। পুলিশ জানিয়েছে, চীনা ব্যবসায়ী গাজীপুরের একটি ব্যাংক থেকে ওই এক কোটি টাকা তুলেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার উদ্দেশ্যেই টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। টাকা গাড়িতে রাখার পর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই চালক গাড়ি নিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে। রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এইচ এম সালাহউদ্দিন বলেন, মামলা হওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। চালককে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এর আগে গুলশান থানার ওসি দাউদ হোসেন বলেন, মঙ্গলবার রাতে অভিযোগ পাওয়ার পর গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে। পরে ঘটনাটি কোন থানার এখতিয়ারভুক্ত, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাহিদ হাসানের বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার আন্দুলিয়া গ্রামে। প্রায় চার মাস আগে তিনি ল্যাভেন্ডার গ্রুপে গাড়িচালক হিসেবে চাকরি নেন। তিনি রাজধানীর উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরে থাকতেন বলে জানা গেছে। ঘটনার পর চীনা ব্যবসায়ী পুলিশকে জাহিদকে নিয়োগের সময় নেওয়া প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিয়েছেন। দ্রুত টাকা উদ্ধারের জন্য তিনি পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছেন। অল্প সময়ের চাকরির মধ্যেই তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের টাকা কীভাবে গেল এবং টাকা নিয়ে পালানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল কি না, তদন্তে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘটনার পর চালকের পাঠানো খুদে বার্তাটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেখানে ‘বাধ্য করা হয়েছে’ এবং ‘বেঁচে থাকলে টাকা ফেরত দেব’—এ ধরনের বক্তব্য রয়েছে। তবে কে বা কারা তাঁকে বাধ্য করেছে, আদৌ অন্য কেউ এই ঘটনায় জড়িত কি না, কিংবা বার্তায় বলা কথাগুলো সত্য কি না—এসবের কোনোটি এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাটির ছায়া তদন্তও শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। টাকা কোথা থেকে তোলা হয়েছিল, গাড়ির গতিপথ কী ছিল, চালক কোথায় গাড়ি রেখে গেছেন, এরপর তিনি কোন পথে পালিয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে অন্য কারও যোগাযোগ ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এক কোটি টাকা নিয়ে চালকের উধাও হয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে এবং গাড়িটি উদ্ধার হয়েছে। তবে টাকার সন্ধান পাওয়া যায়নি, চালকও গ্রেপ্তার হননি। ফলে বিপুল অঙ্কের টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার নেপথ্যে আর কেউ ছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের অন্যতম বড় বিষয়। সূত্র: সমকাল