প্রকাশ :: ... | ... | ...

চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ


সংযুক্ত ছবি

বাংলাদেশ সরকার চীনের তৈরি জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনায় বেশ ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। জে-১০সিই কেনার সম্ভাবনার বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমানের কথিত কার্যকারিতা বাংলাদেশকে এই বিমান নিয়ে আগ্রহী করেছে। তাঁর ভাষ্য, রাফালের মতো আধুনিক যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে জে-১০ ভালো করেছে—এমন অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ বিবেচনায় নিয়েছে। তবে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০ দিয়ে ভারতীয় রাফাল ভূপাতিত করার দাবিটি স্বাধীনভাবে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ বিষয়ে দাবি ও পাল্টা দাবি এসেছে। জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘চীনের তৈরি একটি মাল্টিরোল ফাইটার। এখন রাফালকে বলা হয় ৪.৫ জেনারেশনের সবচেয়ে আধুনিক ফাইটারগুলোর একটি। তার সঙ্গে কমব্যাট সিচুয়েশনে খুবই ভালো করেছে। সো, বাংলাদেশ সেদিকে মনোযোগ দিয়েছে এবং আশা করা যায় আমরা এই পথে খুব ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।’ জে-১০সিই হচ্ছে চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। আধুনিক এ যুদ্ধবিমানকে ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে আধুনিক রাডার, অ্যাভিওনিকস, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধবিমান সংগ্রহের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সরকারি নথির বরাত দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছিল, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ২০টি জে-১০সিই কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওই পরিকল্পনায় বিমান, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তখনকার হিসাবে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রস্তাবিত ওই প্যাকেজে শুধু যুদ্ধবিমান কেনাই নয়, পাইলট ও গ্রাউন্ড ক্রুদের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হয়েছিল। অর্থ পরিশোধের মেয়াদও কয়েক বছর ধরে রাখার পরিকল্পনার কথা সরকারি নথির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০টির পরিবর্তে ২৪টি পর্যন্ত জে-১০সিই কেনার সম্ভাবনার কথা এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত চুক্তি, বিমানের সঠিক সংখ্যা, অস্ত্রের প্যাকেজ এবং মোট মূল্য সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বিষয়কে এখনো আলোচনাধীন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জাহেদ উর রহমান যুদ্ধবিমানটির দামের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একই ধরনের সক্ষমতার ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনা যুদ্ধবিমানের দাম তুলনামূলকভাবে কম। তিনি বলেন, ‘সিমিলার কোয়ালিটির রাফাল বলি বা ইউরোফাইটার টাইফুন বলি, ইউরোপীয়ান ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় চাইনিজ ফাইটারগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম।’ সরকারি নথির ভিত্তিতে প্রকাশিত আগের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রস্তাবিত ২০টি জে-১০সিইর মূল বিমানমূল্য প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছিল। প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, পরিবহন, রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামোসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ হয়ে পুরো কর্মসূচির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য জে-১০সিই কেনার বিষয়টি বৃহত্তর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ। জে-১০সিই ছাড়াও আধুনিক যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার ও ইউএভি ব্যবস্থা সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রেক্ষাপটেও জে-১০সিই কেনার আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের মার্চে চীন সফরের সময় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে চীনা নেতৃত্বের বৈঠকে মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। পরে বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানায়। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময়ও যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পায়। সে সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জে-১০সিই সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি ছিল। বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর বর্তমান যুদ্ধবিমান বহরে চীনা উৎসের এফ-৭ সিরিজের বিমান গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে। আধুনিক জে-১০সিই যুক্ত হলে সেন্সর, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা, দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধ এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধ সক্ষমতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। তবে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে শুধু বিমান সংগ্রহই যথেষ্ট নয়। পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো, খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ, অস্ত্রব্যবস্থা, রাডার ও কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত জে-১০সিই প্যাকেজে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথাই আগের সরকারি নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জাহেদ উর রহমান বলেন, জনগণের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। তাঁর ভাষায়, ‘আশা করি আমাদের সরকার জনগণের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সব রকমের পদক্ষেপ নেবে।’ এদিকে জে-১০সিই নিয়ে আলোচনা এগোলেও চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি হয়েছে—এমন ঘোষণা এখনো আসেনি। ফলে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কতটি বিমান কিনবে, কোন অস্ত্র ও প্রযুক্তি প্যাকেজ থাকবে, মোট ব্যয় কত হবে এবং কবে বিমানগুলো সরবরাহ করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে। বর্তমানে যা নিশ্চিত, তা হলো জে-১০সিই কেনার বিষয়ে বাংলাদেশ-চীন আলোচনা এগিয়ে চলছে এবং সরকার বিষয়টিকে বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।