প্রকাশ :: ... | ... | ...

জুলাইয়ে হত্যা: ‘শহীদ’ এখন সৌদি আরবে, মামলার বাদী ভুয়া


সংযুক্ত ছবি

জুলাই হত্যার মামলায় চাঞ্চল্যকর তদন্ত। ‘নিহত’ ব্যক্তি জীবিত, বাদী ভুয়া; তদন্তে বেরিয়ে আসছে একের পর এক অসঙ্গতি জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, কয়েকটি মামলায় যাদের নিহত দাবি করা হয়েছিল তারা জীবিত অবস্থায় বিদেশে রয়েছেন, কোথাও বাদীর পরিচয়ই ভুয়া, আবার কোথাও অস্তিত্বহীন ব্যক্তিকে নিহত দেখিয়ে মামলা করা হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে নিরীহ মানুষকে আসামি করার অভিযোগও উঠে এসেছে তদন্তে। তদন্ত শেষে ইতোমধ্যে আদালতে জমা দেওয়া একাধিক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তদন্ত কর্মকর্তারা অন্তত তিনটি মামলাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্য কয়েকটি মামলায় পাওয়া গেছে তথ্যগত অসঙ্গতি, জাল কাগজপত্র, ভুল পরিচয় এবং ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার স্পষ্ট অমিল। জুলাইয়ের মামলায় তদন্তে নতুন চিত্র ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলি ও প্রাণহানির ঘটনায় অসংখ্য মামলা দায়ের হয়। সরকার পতনের পর এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন মন্ত্রী-এমপি, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় ৭০৭টি মামলা হয়েছে, যাতে আসামির সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে অধিকাংশ মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ ও পিবিআই। ‘নিহত’ ব্যক্তি এখন সৌদি আরবে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হাতিরঝিল থানার একটি হত্যা মামলা। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর উলন এলাকায় পুলিশের গুলিতে মো. বাবু নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তার খালাতো ভাই পরিচয়ে ইসমাঈল নামে এক ব্যক্তি মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়। কিন্তু তদন্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। পুলিশ জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে জানতে পারে, কথিত নিহত ব্যক্তির প্রকৃত নাম মো. শাকিল। তিনি জীবিত এবং বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত। সৌদি আরব থেকে পাঠানো এক ভয়েস বার্তায় শাকিল বলেন, "আমি তো মারা যাইনি। আমি মরলে সৌদি আরব এলাম কীভাবে? পুলিশ আগেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে।" তদন্তে আরও জানা যায়, মামলার বাদী হিসেবেও যার নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি নিজেই মামলা করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। আদালতেও তিনি একই বক্তব্য দিয়েছেন। জাল মৃত্যুসনদের প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, মামলার সঙ্গে জমা দেওয়া মৃত্যুসনদও জাল। ঘটনাস্থল, সাক্ষ্য, চিকিৎসা নথি, সরকারি শহীদ তালিকা এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে ওই নামে কোনো ব্যক্তি নিহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলাম বলেন, "অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে মামলাটি করেছে বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে।" গুলিবিদ্ধ নয়, পুরনো কাটা দাগ পল্টন থানার আরেকটি হত্যা মামলাতেও উঠে এসেছে একই ধরনের অসঙ্গতি। মামলার বাদী ইয়াসিন আরাফাত দাবি করেছিলেন, ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে পারভেজ আলী নামে এক ব্যক্তি নিহত হন এবং তিনিও গুলিবিদ্ধ হন। তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, পারভেজ আলী নামে কোনো নিহত ব্যক্তির অস্তিত্বই নেই। আর বাদীর পায়ে যে দাগ রয়েছে, সেটি গুলির নয়; বরং পুরনো কাটা বা আঁচড়ের দাগ। পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মাসুদ রানা বলেন, "গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির পক্ষে তিনি কোনো চিকিৎসা নথি দেখাতে পারেননি। এমনকি তার বাবাও জানতেন না যে তিনি নাকি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।" শত শত কিলোমিটার দূরের মানুষও আসামি এই মামলায় পাবনার দুই ট্রাকচালক আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে আসামি করা হয়। তদন্তে তাদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলস (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনার সময় তারা ঢাকায় ছিলেনই না। আব্দুল মতিন বলেন, "আমার বাবার জন্মেও এই বাদী বা যে মারা গেছে বলে বলা হচ্ছে, তাদের নাম শুনিনি।" তিনি অভিযোগ করেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি ষড়যন্ত্র করে তাদের মামলায় জড়িয়েছেন। বাদীই নিখোঁজ আদাবর থানার আরেকটি হত্যা মামলার তদন্তেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ মামলায় আলী মিয়া নামে একজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হলেও তদন্তে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মামলার বাদী তোহা খানের দেওয়া মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায় এবং ঠিকানায় গিয়েও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। পুলিশ শেষ পর্যন্ত মামলাটিকেও সম্পূর্ণ মিথ্যা হিসেবে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। তদন্তে উঠে আসছে অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কিছু অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া মামলা করে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, জমিজমার বিরোধ কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের মামলায় জাল কাগজপত্র, ভুয়া পরিচয়, অস্তিত্বহীন ভুক্তভোগী এবং প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত মামলার ওপর প্রভাবের শঙ্কা আইনজীবীরা বলছেন, ভুয়া মামলা প্রকৃত ভুক্তভোগীদের বিচারপ্রক্রিয়াকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তিনি বলেন, "একাধিক ভুয়া মামলা সামনে এলে বিচারকদের মধ্যেও একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে সব অভিযোগই হয়তো সত্য নয়। ফলে প্রকৃত মামলার বিচারেও পরোক্ষ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।" ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা? পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আইন অনুযায়ী মিথ্যা মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জুলাই-সংশ্লিষ্ট ভুয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকার চাইলে এ বিষয়ে বিশেষ সিদ্ধান্তও নিতে পারে। তদন্তের বার্তা আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি নির্দোষ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তদন্তে উঠে আসা ভুয়া মামলা ও জাল নথির ঘটনা ভবিষ্যতে ফৌজদারি মামলার গ্রহণযোগ্যতা এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর জনআস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।