ছবি : সংগৃহীত
১২ রুটে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে, ৩৯ কিলোমিটার ইস্ট-ওয়েস্ট এক্সপ্রেসওয়ে ও ৮৮ কিলোমিটার রিং রোডের পরিকল্পনা ঢাকার অসহনীয় যানজট কমানো, রাজধানীর ভেতর দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলের চাপ হ্রাস এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় একাধিক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনায় রয়েছে ১২টি রুটে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে, ৩৯ দশমিক ২৪ কিলোমিটার ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ৮৮ কিলোমিটার ইনার সার্কুলার রিং রোড। এর পাশাপাশি ঢাকা-আশুলিয়া ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, বিভিন্ন নদীর ওপর নতুন সেতু এবং বিকল্প মহাসড়ক তৈরির কাজও চলছে বা প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে সারা দেশে ৭৭টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫০ সাল নাগাদ ৫৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু রাজধানীর যানজট কমানো নয়; বরং উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন সহজ করা, জাতীয় মহাসড়কগুলোর ওপর চাপ কমানো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যপত্রে এসব পরিকল্পনা ও প্রকল্পের অগ্রগতির তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কার্যপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভৌত অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং পঞ্চবটি-মুক্তারপুর দোতলা সড়ক প্রকল্পের অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। ৪৪ কিলোমিটার নিরবচ্ছিন্ন উড়ালসড়কের লক্ষ্য ঢাকার উত্তরাঞ্চলের সাভার, আশুলিয়া, নবীনগর ও ইপিজেড-সংলগ্ন শিল্প এলাকার যানজট কমাতে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া হয়ে ইপিজেড পর্যন্ত বিস্তৃত প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। চায়না এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৭৩ শতাংশ এবং নির্মাণকাজের ভৌত অগ্রগতি ৬৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রকল্পের আওতায় ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সার্ভিস লেন ২ সেপ্টেম্বর যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়নাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৮ হাজার ৯৪০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। র্যাম্পসহ প্রকল্পটির মোট দৈর্ঘ্য ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল উড়ালসড়ক ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার এবং র্যাম্প ২৭ কিলোমিটার। প্রকল্পটি তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রথম ধাপের ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপের ৮৬ দশমিক ০২ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপের ২১ দশমিক ৩১ শতাংশ ভৌত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৭৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ইতোমধ্যে বিমানবন্দরের দক্ষিণে কাওলা থেকে ফার্মগেট ও হাতিরঝিল পর্যন্ত র্যাম্পসহ মোট ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশ যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। এ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের ব্যয় নির্বাহে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ‘সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রজেক্ট’ নামে একটি সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ঢাকা-আশুলিয়া ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হলে সাভার ইপিজেড থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ৪৪ কিলোমিটার নিরবচ্ছিন্ন উড়ালসড়ক তৈরি হবে বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উত্তরাঞ্চল থেকে আসা যানবাহন রাজধানীর অভ্যন্তরীণ সড়কে না ঢুকেই দক্ষিণাঞ্চলের দিকে যেতে পারবে। তবে যানজট কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে সংযোগ সড়ক, প্রবেশ ও বহির্গমনপথ এবং আশপাশের সড়কের সক্ষমতার ওপরও। ৩৯ কিলোমিটার ইস্ট-ওয়েস্ট এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকার চারপাশে বিকল্প সড়ক যোগাযোগ গড়ে তুলতে ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বালিয়াপুর থেকে নিমতলী, কেরানীগঞ্জ, ফতুল্লা ও বন্দর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ পর্যন্ত প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়েটির দৈর্ঘ্য ৩৯ দশমিক ২৪ কিলোমিটার। পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এর হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় মহাসড়ক এন-৫, এন-৮ ও এন-১-এর মধ্যে উন্নত সংযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ঢাকার ভেতরে প্রবেশ না করেই এক মহাসড়ক থেকে অন্য মহাসড়কে যাওয়ার সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে পণ্যবাহী যানবাহনের জন্য বিকল্প পথ তৈরি হলে রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে চাপ কমতে পারে। তবে প্রকল্পটির নির্মাণ শুরু করতে অর্থায়ন, বাস্তবায়ন কাঠামো ও অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। এদিকে, ঢাকা এলিভেটেড ইনার সার্কুলার রিং রোডের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২৪ সালে সম্পন্ন হয়েছে। প্রস্তাবিত রিং রোডের মোট দৈর্ঘ্য ৮৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ২৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার অংশ উড়ালসড়ক হিসেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরুর কথা রয়েছে। রিং রোড বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে বিকল্প যোগাযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলমুখী যানবাহনের চলাচল সহজ করা এবং যাত্রাবাড়ী-পোস্তগোলা এলাকায় যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল নির্ভর করবে পুরো রিং রোডের সংযোগ, সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় এবং যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থাপনার ওপর। ১২ রুটে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন ও সড়কের ওপর চাপ কমাতে ১২টি রুটে মোট ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। সমীক্ষাটি পরিচালনায় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে ৩০৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২২ সালের জুনে এ সমীক্ষা প্রকল্প শেষ হয়। তবে সাবওয়ে নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সমীক্ষায় প্রস্তাবিত রুটগুলোর মধ্যে ‘ও’ রুটের দৈর্ঘ্য ৩৪ দশমিক ৯২ কিলোমিটার। টঙ্গী থেকে মহাখালী ও সদরঘাট হয়ে ঝিলমিল পর্যন্ত বিস্তৃত এ রুটে ২৪টি স্টেশন রাখার প্রস্তাব রয়েছে। ‘বি’ রুটের দৈর্ঘ্য ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার। গাবতলী থেকে বিসিএসএওএইচএস-ঢেলনা পর্যন্ত এ রুটে ১৪টি স্টেশন রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। সাবওয়ে নির্মাণ করা গেলে ব্যস্ত সড়কের নিচ দিয়ে যাত্রী পরিবহনের নতুন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। এতে সড়কপথে যাতায়াতের চাপ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থায়ন, ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোর জটিলতা, স্টেশন ও অন্যান্য সংযোগব্যবস্থা এবং নির্মাণকালে নগরজীবনে প্রভাবের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়া মানেই নির্মাণকাজ শুরু বা অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়া নয়। পঞ্চবটি-মুক্তারপুর দোতলা সড়ক শেষ পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও দোতলা রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ১০ দশমিক ৮১ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ এবং ৯ দশমিক ০৬ কিলোমিটার দোতলা সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। দোতলা সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা যানবাহনের একটি অংশকে রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ না করেই বিকল্প পথে চলাচলের সুযোগ দেওয়া যাবে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলমুখী যানবাহন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যেতে পারবে। এতে নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার যানজট এবং জনদুর্ভোগ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর সেতুর পাশে দুই লেনের দ্বিতীয় একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশন নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। চীনের শতভাগ অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণের অনুরোধ জানিয়ে ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর সেতু বিভাগ থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পায়রা, মেঘনা ও বরিশাল-ভোলা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার কচুয়া-বেতাগী সড়কে পায়রা নদীর ওপর ১ হাজার ৬৯০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১ হাজার ৪২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এর ভৌত অগ্রগতি ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মতলব উত্তর-গজারিয়া সড়কে মেঘনা-ধনাগোদা নদীর ওপর ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ১৭৪ কোটি ৬৭ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৬৬০ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের (ইডিসিএফ) ঋণ ৩ হাজার ৫১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। প্রকল্পটির আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ এবং ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র কার্যক্রম চলছে। বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সেতুটি নির্মিত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে বিকল্প সড়ক যোগাযোগ তৈরি হবে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি যাতায়াতের দূরত্ব, সময় ও ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চাপ কমাতে মেঘনা নদীর আরও কয়েকটি স্থানে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু এবং ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর সড়কে ৩ দশমিক ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আলোকে অনুষ্ঠিত সপ্তম ও অষ্টম প্ল্যাটফর্ম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রকল্প ডেলিভারি টিমও গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর সড়কে মেঘনার ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২০ সালে সম্পন্ন হয়। প্রকল্পটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। বিশনন্দী-কড়ইকান্দি ফেরিঘাট এলাকায় প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কার্যপত্রে দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২০২৬ সালের ১৯ অক্টোবর উল্লেখ রয়েছে। সেতুটি নির্মিত হলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর ও নবীনগরের সঙ্গে ঢাকা এবং অন্যান্য জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। একই সঙ্গে এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিকল্প পথ হিসেবেও কাজ করতে পারে। দ্বীপ জেলা ভোলার সঙ্গে বরিশালের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন এবং গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেও কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কার্যপত্রে প্রকল্পটিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী জনসভায় দেওয়া প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে আগের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের আওতায় পুনরায় যাচাই করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আলোকে অনুষ্ঠিত সপ্তম ও অষ্টম প্ল্যাটফর্ম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয় এবং প্রকল্প ডেলিভারি টিম গঠন করা হয়। এ ছাড়া বরিশাল-রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ-ভোলা রুটে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। যমুনা ও পদ্মা সেতুতে টোল আদায় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আওতায় নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর মধ্যে রয়েছে যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, মুক্তারপুর সেতু ও কর্ণফুলী টানেল। এগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন এবং পণ্য পরিবহনে ভূমিকা রাখছে। কার্যপত্রে যমুনা ও পদ্মা সেতু এবং কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ ব্যয়, টোল আদায় ও ঋণ পরিশোধের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। যমুনা নদীর ওপর ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৭৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ১৯৯৪ সালের ১৫ অক্টোবর মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৯৯৮ সালের জুনে শেষ হয়। একই বছরের ২৩ জুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি সেতুটিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অপটিক্যাল ফাইবার টেলিফোন লাইন স্থাপন করা হয়েছে। কার্যপত্র অনুযায়ী, সেতুটি চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টোল বাবদ ১০ হাজার ২৮৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। অন্যদিকে, সেতু নির্মাণের জন্য নেওয়া ঋণের বিপরীতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৫১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় নির্মিত পদ্মা সেতু ২০২২ সালের ২৬ জুন যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টোল বাবদ আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সেতু নির্মাণের জন্য নেওয়া ঋণের বিপরীতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৫১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদনে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ দশমিক ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। এগুলো সমীক্ষাভিত্তিক প্রাক্কলন; প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ধারণে পরবর্তী সময়ের তথ্য ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। কর্ণফুলী টানেলে টোল ১১৬ কোটি টাকা কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক টানেলটি ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম সড়ক টানেল হিসেবে পরিচিত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ২৫৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা। কার্যপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টানেলটি থেকে টোল বাবদ ১১৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। টানেলটি চট্টগ্রাম শহরের পশ্চিম অংশের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব অংশের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করেছে। সেতু বিভাগের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, এর ফলে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে পণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ উন্নত হয়েছে। তবে টোল আদায়, পরিচালন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন করে প্রকল্পটির আর্থিক কার্যকারিতা বিচার করা প্রয়োজন। ২০৫০ সাল পর্যন্ত ৫৭ প্রকল্পের পরিকল্পনা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে সারা দেশে মোট ৭৭টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫০ সাল নাগাদ ৫৭টি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সমন্বিত ও নিরবচ্ছিন্ন পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প চিহ্নিত করার পাশাপাশি একটি প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা, পাঁচটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পর্যালোচনা এবং চারটি প্রকল্পের প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী, পিরোজপুরের কঁচা ও সন্ধ্যা নদী, সাতক্ষীরার গলঘেসিয়া ও খোলপেটুয়া নদীর মোহনা, খুলনার ভৈরব নদ, বরগুনার বিষখালী নদী, পটুয়াখালী-আমতলী-বরগুনা সড়কের পায়রা নদী এবং বাকেরগঞ্জ-বাউফল সড়কের কারখানা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ। কক্সবাজার-মহেশখালী চ্যানেলের ওপর সেতু বা টানেল নির্মাণের সম্ভাবনাও পরিকল্পনায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের সব কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়নি; অনেকগুলো এখনো পরিকল্পনা বা সমীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৃক্ষরোপণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কার্যপত্রে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু সার্ভিস এলাকায় ৬ দশমিক ০৩ মেগাওয়াট এবং সেতু ভবনের ছাদে ২৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। কর্ণফুলী টানেল এলাকায় প্রায় ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। পাশাপাশি সেতু ভবন প্রাঙ্গণে ৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির আলোকে সেতু কর্তৃপক্ষের সাইট অফিস ও প্রকল্প এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮২০টি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কার্যপত্রে ইতোমধ্যে রোপণ করা গাছের সংখ্যা ‘২৩ হাজার ৭৭৪৭’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সংখ্যাগতভাবে অস্পষ্ট। প্রকাশের আগে সেতু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকার যানজট কমাতে সাবওয়ে, এক্সপ্রেসওয়ে ও রিং রোডের পরিকল্পনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে প্রকল্পের ঘোষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা থেকে বাস্তব সুফল পেতে সময়মতো অর্থায়ন, নির্মাণকাজের মান, প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সংযোগ সড়কের উন্নয়ন এবং সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশের পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তথ্যসূত্র : ঢাকা পোস্ট