ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ১৬ ডিসেম্বর সীমিত পরিসরে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও প্রায় দুই বছর ধরে অব্যবহৃত থাকা এই স্থাপনা চালুর প্রস্তুতি এগোলেও পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি নিয়ে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তে সমঝোতা হয়নি। রাজস্ব ভাগাভাগি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়, আইনি সুরক্ষা এবং প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা—এই চার বিষয়ে মতপার্থক্য চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। ফলে এখন শুধু দুই পক্ষের দরকষাকষি নয়, জাতীয় স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিবেচনায় সরকারের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৫ বছর মেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) এই চুক্তির শর্ত নির্ধারণে সামান্য ছাড়ও ভবিষ্যতে বড় আর্থিক প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে টার্মিনাল চালুর প্রথম দিন কতটি ফ্লাইট পরিচালিত হবে, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। বেবিচক প্রথম দিন অন্তত ১০টি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায়। জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব চারটি—দুটি আগমন ও দুটি বহির্গমন। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আগামী ৩ নভেম্বর স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। একই বৈঠকে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি সইয়ের তারিখ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) আবু সাঈদ মেহবুব খান জানিয়েছেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা শেষ হয়েছে। তবে নতুন কিছু শর্তের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগোবে বলে আশা করছেন তিনি। বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতও জানিয়েছেন, ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে। যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হবে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। চার শর্তে মূল বিরোধ সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বিরোধ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বা উড়োজাহাজ ও যাত্রীদের ভূমিতে সেবা দেওয়ার কার্যক্রমের দায়দায়িত্ব নিয়ে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব অনুযায়ী, এ কার্যক্রমের সার্বিক দায় ও ঝুঁকির বড় অংশ বহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। কিন্তু এর বিনিময়ে বিমানের আয়ের অংশ কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, পরিচালন ব্যয় কীভাবে পরিশোধ হবে এবং কোনো ক্ষতি হলে দায় কে নেবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট সমঝোতা হয়নি। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিমানবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয় ও সেবাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম। তাই এর দায়িত্ব এক প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকলেও ব্যয়, আয় ও ক্ষতির দায় অন্য পক্ষের ওপর পড়লে আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চুক্তিতে দায়িত্ব ও ঝুঁকির পাশাপাশি অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা স্পষ্ট না হলে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয় বিরোধ রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে। আগে বাংলাদেশকে ২৭ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা থাকলেও পরিচালনার প্রথম আট মাসে এ হার কমিয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জাপানি পক্ষ। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজস্বপ্রাপ্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তবে এ সময়ের জন্য রাজস্বের হিসাব কীভাবে নির্ধারিত হবে, কোন কোন আয় ভাগাভাগির আওতায় আসবে এবং পরবর্তী সময়ে ২৭ শতাংশ হারে যাওয়ার শর্ত কী হবে—এসব বিষয় চুক্তিতে পরিষ্কার থাকা জরুরি। টার্মিনাল চালুর শুরুতে যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা সীমিত থাকতে পারে। এ সময় আয় কম হওয়ার যুক্তি দেখিয়ে রাজস্বের হার কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা বাংলাদেশের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটি আর্থিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ১৫ বছরের চুক্তিতে প্রথম কয়েক মাসের রাজস্ব ছাড়ের প্রভাব এবং পরবর্তী সময়ে আয় বাড়ার সম্ভাবনা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয় বিরোধ আইনি সুরক্ষা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন কিংবা বিদ্যমান আইন সংশোধন করলে তা জাপানি কনসোর্টিয়ামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হওয়ার মতো বিশেষ সুবিধা চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান হলো, দেশের প্রচলিত আইন এবং ভবিষ্যতে সাধারণভাবে প্রযোজ্য আইনি পরিবর্তনের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। এ ধরনের শর্তের প্রভাব শুধু চুক্তির মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভবিষ্যতে বিরোধ নিষ্পত্তি, দায় নির্ধারণ এবং দেশের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। ফলে কোনো আইনি ছাড়ের প্রস্তাব থাকলে তার পরিধি, প্রয়োজনীয়তা ও পরিণতি আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে খুঁটিয়ে যাচাই করা জরুরি। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন প্রয়োগের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে কী ধরনের চুক্তিগত সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। চতুর্থ বিরোধ প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধনের দায়বদ্ধতার সময়সীমা নিয়ে। ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) হিসেবে বাংলাদেশ নয় মাস রাখতে চায়। অন্যদিকে জাপানি কনসোর্টিয়াম তা ১২ মাস করার পক্ষে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে দায়দায়িত্বের মেয়াদ নিয়েও নতুন শর্ত এসেছে। আগে এ ক্ষেত্রে ছয় মাসের কথা থাকলেও এখন ১২ মাস পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোন ধরনের ত্রুটির দায় কে বহন করবে, ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধনের খরচ কার ওপর পড়বে এবং যন্ত্রাংশ বিকল হলে কত দিন পর্যন্ত সরবরাহকারী বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ দায়ী থাকবে। এসব বিষয় অস্পষ্ট থাকলে টার্মিনাল চালুর পর যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যয় নিয়ে নতুন বিরোধ দেখা দিতে পারে। বিকল্প অপারেটর না রাখার প্রশ্ন দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার পেছনে বিকল্প ব্যবস্থাপনা প্রস্তুত না রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেছেন, শুরু থেকেই বিকল্প অপারেটরের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, একটি মাত্র অপারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তির আর্থিক শর্ত, পরিচালন ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা ভালোভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন সরকার জানিয়েছিল, শর্ত নিয়ে সমঝোতা না হলে অন্য আন্তর্জাতিক অপারেটর খোঁজা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় বিকল্প নিয়োগের প্রক্রিয়া এগোয়নি। এখন চুক্তির শেষ পর্যায়ে নতুন শর্ত সামনে আসায় সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিকল্প অপারেটর নিয়োগের পথও সহজ নয়। নতুন করে দরপত্র আহ্বান, কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং চুক্তি সম্পাদনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে টার্মিনাল চালুর সময়সীমা পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে সরকারের সামনে একদিকে দ্রুত চালুর লক্ষ্য, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দেশের স্বার্থ সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ। জাপানি কনসোর্টিয়ামটি চারটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত—জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন। প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় তারা ১৫ বছর টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাবে। চুক্তি সইয়ের আগে আরও কয়েক ধাপ আলোচনা শেষ হলেও চুক্তি সইয়ের আগে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনসহ কয়েকটি আনুষ্ঠানিকতা বাকি রয়েছে। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তার মতে, এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে অন্তত নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে চুক্তি সইয়ের সময়সূচি ও টার্মিনাল চালুর সময়সূচি এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ ডিসেম্বর পরীক্ষামূলক বা সীমিত পরিসরে উদ্বোধনের প্রস্তুতি আলাদা প্রক্রিয়ায় চলছে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করতে পরিচালন প্রস্তুতি, যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, জনবল, নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের মতো সেবাগুলো ধাপে ধাপে প্রস্তুত করতে হবে। ফলে নির্ধারিত দিনে উদ্বোধন হলেও সব কার্যক্রম একসঙ্গে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। টার্মিনালটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে আংশিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্পটির নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা; এর বড় অংশ জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার ঋণ থেকে এসেছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় অব্যবহৃত স্থাপনা দ্রুত কাজে লাগানোর অর্থনৈতিক চাপও রয়েছে। কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা যাচাই না করে চুক্তি করা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য, দরকষাকষিতে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সব মিলিয়ে, তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রশ্নটি এখন আর শুধু উদ্বোধনের তারিখে সীমাবদ্ধ নেই। ১৫ বছরের পরিচালনা চুক্তিতে রাজস্বের নিশ্চয়তা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব, আইনি ক্ষমতা এবং ত্রুটির দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, তার ওপর নির্ভর করছে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও পরিচালনগত সাফল্য। সরকারের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ—১৬ ডিসেম্বরের লক্ষ্য ধরে রেখে এমন চুক্তি করা, যাতে দ্রুত চালুর তাগিদে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।