শতভাগ পাসের মাদরাসা ৪১০ থেকে নেমে ৮৮, শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ৮২ থেকে বেড়ে ২২৬; পাস করেছে মাত্র ৫৫.৪৯ শতাংশ দাখিলের এবারের ফল শুধু পাসের হার কমার একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং মাদরাসা শিক্ষার মান ও প্রতিষ্ঠানগুলোর একাডেমিক সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা মাদরাসার সংখ্যা কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ। বিপরীতে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৭৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে যেখানে সারা দেশে ৪১০টি মাদরাসার সব পরীক্ষার্থী পাস করেছিল, এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৮৮টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান কমেছে ৩২২টি। আর শূন্য পাসের মাদরাসা ৮২টি থেকে বেড়ে হয়েছে ২২৬টি। অর্থাৎ বেড়েছে ১৪৪টি প্রতিষ্ঠান। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ১৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। শুধু তাই নয়, ১০ শতাংশের নিচে পাসের হার থাকা মাদরাসার সংখ্যাও দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ১০৬টি, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৬টিতে। সব মিলিয়ে দাখিলের ফলাফলে যে চিত্র সামনে এসেছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে—মাদরাসাগুলোতে শিক্ষার মান কি এতটাই নেমে গেছে, নাকি পরীক্ষাব্যবস্থায় কড়াকড়ি ও মূল্যায়নের পরিবর্তনের কারণে এবার প্রকৃত চিত্রটি প্রকাশ পেয়েছে? পাস করেনি ১ লাখ ৩২ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের এই ধসের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সার্বিক ফলও স্বস্তিদায়ক নয়। এবার দাখিল পরীক্ষায় ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৭ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। পরীক্ষায় উপস্থিত হয় ২ লাখ ৯৬ হাজার ১৮২ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। অর্থাৎ সার্বিক পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে, ১ লাখ ৩২ হাজার ১৮৫ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে ১৪১ জনকে। সাধারণ শাখায় পাসের হার ৫৪ দশমিক ২২ শতাংশ। এ শাখায় ছাত্রীদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ হলেও ছাত্রদের ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছে ৫০ দশমিক ১১ শতাংশে। বিজ্ঞান শাখায় তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছে। সেখানে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ছাত্রদের ৬১ দশমিক ১৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ মাত্র ৬ হাজার ৭১৬ পাসের হারের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ফলের ক্ষেত্রেও বড় কোনো উচ্ছ্বাস নেই। এবার দাখিলে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৭১৬ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৩ হাজার ৫৭২ জন এবং ছাত্রী ৩ হাজার ১৪৪ জন। মোট উপস্থিত পরীক্ষার্থীর তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়ার হার মাত্র ২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এবার জিপিএ-৪ পেয়েছে ৩৩ হাজার ৩৩৬ জন। ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৯৯ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৪২২ জন। ৩ থেকে ৩ দশমিক ৪৯ পেয়েছে ৪১ হাজার ৬২৫ জন। আর সর্বনিম্ন ধাপে জিপিএ-১ নিয়ে পাস করেছে ১ হাজার ৫৩৬ জন। ঢাকায় সাফল্য, সিরাজগঞ্জে তলানি দাখিলের ফলাফলে জেলার মধ্যেও বড় বৈষম্য দেখা গেছে। পাসের হারে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা জেলা। সেখানে পাসের হার ৮৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। ৮ হাজার ৭১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ হাজার ৭১৮ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৪৬০ জন। এরপর রয়েছে কক্সবাজার, ফেনী ও চট্টগ্রাম। কক্সবাজারে পাসের হার ৭৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ফেনীতে ৭৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৭১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে ফলাফলের তলানিতে সিরাজগঞ্জ। সেখানে পাসের হার মাত্র ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। বরগুনায় ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ঝালকাঠিতে ৩৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। রাজশাহীতে পাসের হার ৩৯ দশমিক ১০ শতাংশ, রংপুরে ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, কুড়িগ্রামে ৪৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৪৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ একই শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে এক জেলার সঙ্গে অন্য জেলার ফলাফলের ব্যবধান ৪০ শতাংশেরও বেশি। এই বৈষম্যও মাদরাসা শিক্ষার মান, শিক্ষকতা, প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে আলাদা করে ভাবার দাবি রাখে। পরীক্ষায় কড়াকড়ির প্রভাব কি? ফল বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এবার পরীক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এসেছে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান জানিয়েছেন, এবার পরীক্ষাব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে অনেক মাদরাসা নিজ নিজ কেন্দ্রে পরীক্ষা নিলেও এবার দাখিল ও আলিম পরীক্ষার্থীদের অন্য কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তার মতে, এর ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে আগে অনিয়মের সুযোগ থাকলে এবার তা কমেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পরীক্ষাব্যবস্থাপনায় বাড়তি নিয়ন্ত্রণও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, ফল কেন এতটা খারাপ হয়েছে, সেটি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। ‘একজনও পাস করবে না—এটা অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়’ শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বোর্ড চেয়ারম্যানের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন। তার ভাষায়, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করবে না—এটা অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ কেমন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম কেমন এবং একাডেমিক মান কোন পর্যায়ে—তা খতিয়ে দেখা হবে। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির বিষয়ও পর্যালোচনা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এতে বোঝা যাচ্ছে, এবার শুধু ফল প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে না মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। ফলাফলের পেছনের কারণ খুঁজে বের করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহির দিকে যাওয়ার কথাও ভাবছে কর্তৃপক্ষ। সামনে কঠিন পরীক্ষা দাখিলের এবারের ফল তাই শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং এটি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাগুলো নতুন করে সামনে এনেছে। শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান কমে যাওয়া, শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়ে যাওয়া, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং জেলা ও প্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের বড় ব্যবধান—সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই: মাদরাসা শিক্ষার মান কোথায় দাঁড়িয়ে? বোর্ড চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবার প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পর্যালোচনা, মনিটরিং এবং একাডেমিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে জোর দেওয়া হবে। তবে ফলের পরিসংখ্যানের বাইরে আসল পরীক্ষা এখন শুরু—যে ২২৬টি মাদরাসায় একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানে কেন এমন ফল হলো এবং পরের বছর সেই চিত্র কতটা বদলানো যায়। মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে এবার কথার চেয়ে কার্যকর নজরদারি, শিক্ষকতার মান, নিয়মিত পাঠদান এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জবাবদিহিই হতে পারে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।