বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী দলটি সংসদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়েছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর ভোটের মাধ্যমে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে যাচ্ছে দলটি। এই নির্বাচন ছিল বিএনপির জন্য ঐতিহাসিক। কারণ এবারই প্রথম দলের বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি এবং তিনিও প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। দলের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তারেক রহমানই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে অভিনন্দন বার্তা পেতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর তিনি গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। এর মাত্র কয়েকদিন পর, ৩০ ডিসেম্বর, তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর থেকে দলটি আর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল না। সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকার পরিচালনা করেছিল বিএনপি। সেই সময় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ ছিল দলটি। এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিল তাদের সাবেক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এবার প্রায় ৭৭টি আসনে জয় পেয়েছে, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। তবে দলের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন এই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। দলীয় প্রধান **শেখ হাসিনা**সহ অনেক শীর্ষ নেতা বিদেশে অবস্থান করছেন এবং দেশে থাকা নেতাদের একটি বড় অংশ গ্রেপ্তার হন। ফলে নির্বাচনে কার্যত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, এবার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। কয়েকটি আসনে মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ফল ঘোষণা স্থগিত রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের পরই নতুন সংসদের শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ও প্রত্যাবর্তন বিএনপির ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় তিনি দলে সক্রিয় হন এবং ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে অধিষ্ঠিত হন। ২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর তিনি লন্ডন থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ১৮ মাস কারাভোগের পর তিনি লন্ডনে চলে যান এবং সেখান থেকেই দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো পরবর্তীতে প্রত্যাহার বা অব্যাহতি পায়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই বিজয় শুধু দলীয় নয়, এটি জনগণের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতিফলন। দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, “এই বিজয় গণতন্ত্রের, এই বিজয় বাংলাদেশের।” অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির দাবি, অনেক জায়গায় ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না এবং প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি। সব মিলিয়ে, দুই দশক পর বিএনপির এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা শক্তিশালী করতে পারবে—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।