স্বাধীনতার পর থেকে নানা রাজনৈতিক সংকট, সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড, গণআন্দোলন, সাংবিধানিক পরিবর্তন ও ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ। আর এসব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে দেশের রাষ্ট্রপতির পদে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত ১৮ জন পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনই স্বাভাবিকভাবে নিজেদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। কেউ রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, কেউ সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, কেউ গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক চাপের কারণে বঙ্গভবন ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সবশেষ এই তালিকায় যুক্ত হলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের মাধ্যমে তাঁর রাষ্ট্রপতি জীবনেরও আকস্মিক সমাপ্তি ঘটল। কেন এত রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ করতে পারেননি? স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতিদের মেয়াদ অসমাপ্ত থাকার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, সামরিক অভ্যুত্থান। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে একাধিক রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি হত্যা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তৃতীয়ত, গণআন্দোলন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়। চতুর্থত, রাজনৈতিক চাপ। ২০০২ সালে বিএনপির সংসদীয় দলের অনাস্থার মুখে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করেন। পঞ্চমত, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট।** বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি ও সরকারব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে রাষ্ট্রপতি পদেও পরিবর্তন এসেছে। ব্যতিক্রমী ইতিহাস বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—দেশের ১৮ জন রাষ্ট্রপতির মধ্যে মাত্র একজন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন। তিনি জিল্লুর রহমান। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন। আবু সাঈদ চৌধুরী, আবু সাদাত সায়েম, এরশাদ, বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ কয়েকজন রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে। আর সর্বশেষ মো. সাহাবুদ্দিনও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করার আগেই পদত্যাগ করলেন। রাষ্ট্রপতি পদ কেন বারবার রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির পদ কখনো ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, আবার কখনো ছিল মূলত আনুষ্ঠানিক পদ। ১৯৭৫ সালের আগে দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু ছিল। পরে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। এরপর সামরিক শাসন, গণআন্দোলন এবং ১৯৯১ সালে আবার সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার চরিত্রও বদলে যায়। বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্রপতির পদটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তন, সংসদ ভেঙে দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন বা নতুন সরকারের শপথ—এসব সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাস আসলে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময়ে রাষ্ট্রপতির পদ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড, গণআন্দোলন ও ক্ষমতার পালাবদলের সাক্ষী হয়েছে। ১৮ জন রাষ্ট্রপতির মধ্যে ১০ জনই তাঁদের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ করতে পারেননি—এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে যেমন তুলে ধরে, তেমনি দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার নানা উত্থান-পতনেরও একটি চিত্র দেয়। সবশেষ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ সেই ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। এখন নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন এবং তাঁর নেতৃত্বে দেশের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা কীভাবে এগিয়ে যায়—সেদিকেই থাকবে সবার নজর। রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় দুজন নিহত বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় দুজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তাঁরা হলেন—স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এ ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান, গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপের কারণে আরও কয়েকজন রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। পরে মুজিবনগর সরকার তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন। ফলে বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন না। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালু হলে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর একটি অংশের হাতে তিনি নিহত হন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেন। পরে তাঁকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর পদত্যাগের পর স্পিকার মোহাম্মদউল্লাহ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। মোহাম্মদউল্লাহ ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্পিকার মোহাম্মদউল্লাহ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। পরের বছর ২৭ জানুয়ারি তিনি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন। তবে তাঁর শাসনও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একই বছরের নভেম্বরে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া বিচারপতি সায়েম ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সময় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সামরিক কর্মকর্তার হাতে তিনি নিহত হন। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া বঙ্গবন্ধুর পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি। তাঁর মৃত্যুর পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। আবদুস সাত্তার জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। পরে ১৯৮১ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে তাঁর রাষ্ট্রপতি জীবনও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। এর মাধ্যমে আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন। এরশাদ সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করেন। বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরী। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল সামরিক শাসক এরশাদের হাতে। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এরশাদ। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এরশাদ। ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে দীর্ঘ গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরশাদের পদত্যাগের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। সাহাবুদ্দীন আহমদ এরশাদের পতনের পর সাহাবুদ্দীন আহমদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৯১ সালে দেশে আবার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা ফিরে আসে। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি ১৯৯৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মেয়াদ শেষ করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। সাহাবুদ্দীন আহমদ ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। তিনি পুরো মেয়াদ শেষ করে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অবসর নেন। এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তবে মাত্র কয়েক মাস পরই তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়। বিএনপির সংসদীয় দলের চাপের মুখে ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর মাজারে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে দলীয়ভাবে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তাঁর পদত্যাগের পর তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। জমির উদ্দিন সরকার বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার। এরপর বিএনপির সমর্থনে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ২০০৬ সালের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। ইয়াজউদ্দিন রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও গ্রহণ করেন। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয়। পরে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এর ফলে ২২ জানুয়ারির নির্ধারিত সংসদ নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায় এবং দেশে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ২০০৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদ শেষ হলেও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি হন জিল্লুর রহমান। রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে জিল্লুর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। আবদুল হামিদ জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের ২০ মার্চ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন আবদুল হামিদ। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং পরপর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আবদুল হামিদই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের একজন এবং সাম্প্রতিক সময়ের একমাত্র রাষ্ট্রপতি যিনি পরপর দুই মেয়াদ পূর্ণ করেন। মো. সাহাবুদ্দিন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর রাষ্ট্রপতি পদ নিয়েও নানা ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তাঁর পদত্যাগের দাবি তোলে। কখনো তাঁকে অপসারণের দাবি, আবার কখনো তাঁর পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যেই ২০২৬ সালে এসে তাঁর পদত্যাগের আলোচনা নতুন করে জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে আরেকটি অসমাপ্ত মেয়াদ যুক্ত হলো।