নবম জাতীয় পে স্কেলের আওতায় আসছেন দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও। সরকারি চাকরিজীবীদের মতো তাঁরাও নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন। নতুন পে স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে। মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন-১ অনুবিভাগের উপসচিব জামিলা শবনম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় বেতন স্কেলে বেতন-ভাতা পান। তাঁরাও নবম পে-স্কেলের আওতায় থাকছেন।’ এদিকে মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন বেতন কাঠামোতে বেতন দেওয়া হবে।’ তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের আওতায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আলাদা কোনো প্রজ্ঞাপন বা আদেশ জারি করা হবে কি না, সে বিষয়ে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। এর আগে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়। পরে সংবাদ সম্মেলনে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তখন বলেছিলেন, এ বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এর পর থেকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় এমপিওভুক্তরা এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন। এমপিও নীতিমালায় ‘বেতন স্কেল’ বলতে জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ এবং সময়ে সময়ে সরকার ঘোষিত জাতীয় বেতন স্কেলকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এবার অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁদের নবম পে স্কেলের আওতাভুক্ত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করায় সেই জটিলতা অনেকটাই কাটল। বর্তমানে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন প্রায় চার লাখ, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন পৌনে দুই লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এমপিও ব্যবস্থায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার একটি বড় অংশ সরকার আর্থিক অনুদান হিসেবে দেয়। তাঁরা জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী শতভাগ মূল বেতন পান। এর সঙ্গে চিকিৎসা ভাতাসহ নির্ধারিত কিছু ভাতা দেওয়া হয়। ১১ বছর পর নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীরা প্রায় ১১ বছর পর নতুন জাতীয় বেতন স্কেল পেতে যাচ্ছেন। সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর নতুন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় আগের মতো ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। নতুন কাঠামোয় তা বেড়ে ২০ হাজার টাকা হবে। আর প্রথম গ্রেডের বর্তমান মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় শুধু মূল বেতন নয়, দীর্ঘদিন ধরে স্থির থাকা বিভিন্ন ভাতা নিয়েও পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে মূল বেতন ও ভাতা একই সময়ে কার্যকর হবে না। তিন ধাপে মূল বেতন, ভাতা ২০২৮ সালে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় নিয়ে সরকার নতুন পে স্কেল একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তিন ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদেরও নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে এমপিওভুক্তদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন বাস্তবায়নের প্রশাসনিক পদ্ধতি, বকেয়া বা পার্থক্যের অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে এবং আলাদা প্রজ্ঞাপন প্রয়োজন হবে কি না—এসব বিষয়ে অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষা করতে হবে। বাড়িভাড়ায়ও পরিবর্তন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে বাড়িভাড়া ভাতাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে তাঁরা মাসে মাত্র ১ হাজার টাকা বাড়িভাড়া পেতেন। পরে বাড়িভাড়া মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে শতাংশভিত্তিক বাড়িভাড়া ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সুবিধার পরিমাণও বাড়তে পারে। তবে কোন ভাতা কী হারে এবং কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সরকারি আদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এখন ছয় লাখের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর প্রধান আগ্রহ নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার দিকে। বিশেষ করে নতুন স্কেলে তাঁদের বেতন কীভাবে পুনর্নির্ধারণ হবে, ১ জুলাই থেকে প্রাপ্য অর্থ কীভাবে সমন্বয় করা হবে এবং ভাতা কার্যকরের পদ্ধতি কী হবে—এসব বিষয়ে দ্রুত স্পষ্ট নির্দেশনা চান তাঁরা।