নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পদত্যাগী দুই ‘ছাত্র উপদেষ্টা’— আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা এই দুই তরুণ নেতার সিদ্ধান্ত বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা, নতুন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এবং জোট রাজনীতির সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দুই সাবেক ছাত্র উপদেষ্টার নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি মূলত বর্তমান রাজনীতির জটিল মেরুকরণ ও আস্থার সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে। অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ছাত্র নেতৃত্ব থেকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এনসিপির জোট রাজনীতি ও আদর্শগত অবস্থান ঘিরে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনি জোট ছাত্র আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই প্রেক্ষাপটে আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো একদিকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কৌশল, অন্যদিকে ছাত্র রাজনীতির নৈতিক অবস্থান রক্ষার বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তাদের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ছাত্র নেতৃত্বের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ কোন পথে এগোবে— সে বিষয়ে নতুন করে বিতর্ক ও পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টার দায়িত্ব পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাধিক সমন্বয়ক। তাদের মধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম ছিলেন আলোচিত মুখ। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে— এই যুক্তিতে গত ১০ ডিসেম্বর তারা উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরদিন ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের পদত্যাগ কার্যকর হয়। এরপর থেকেই তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়। পদত্যাগের পরপরই আসিফ মাহমুদ ঢাকা ও কুমিল্লার বিভিন্ন আসনে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন— এমন খবর গণমাধ্যমে আসে। বিশেষ করে ঢাকা-১০ আসনে তার জনসংযোগ ও গণসংযোগ আলোচনার জন্ম দেয়। অন্যদিকে মাহফুজ আলমের লক্ষ্মীপুর থেকে নির্বাচন করার সম্ভাবনা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে কথা চলতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচন করতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্রুত পরিবর্তন আসে। অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনি জোট গঠনের উদ্যোগ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার পরই এনসিপির ভেতরে ও বাইরে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। দলটির একাধিক নেতা প্রকাশ্যে আপত্তি জানান। তাসমিন জারা, তাজনূভা জাবীনসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা দল ছাড়েন। এমনকি এনসিপির ৩০ নেতা আহ্বায়ক বরাবর চিঠি দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট না করার আহ্বান জানান। এই প্রেক্ষাপটেই প্রথমে মাহফুজ আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট করে জানান, তিনি এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন না। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “এই এনসিপির অংশ আমি হচ্ছি না।” পরে তিনি বিবিসি বাংলাকে জানান, নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত তার আগেই নেওয়া ছিল। তার ভাষায়, ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের বাইরে থাকা মানেই নির্বাচনে যাওয়া নয়। বরং নিরপেক্ষতা প্রশ্নে যেন বিভ্রান্তি না তৈরি হয়, সে কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। মাহফুজ আলম আরও বলেন, সরকার থেকে সরে যাওয়ার পরও তিনি নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। তবে তার ভাই মাহবুব আলম এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি বলেন, “তিনি নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন করবেন। এতে আমার কোনো ভূমিকা নেই।” অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদ শুরুতে নীরব থাকলেও সোমবার সন্ধ্যায় এনসিপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন, তবে একই সঙ্গে জানান— তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না। দলীয় সিদ্ধান্ত ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তিনি নির্বাচনি প্রতিযোগিতার বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। এনসিপিতে যোগ দেওয়ার পর আসিফ মাহমুদকে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান, আসিফ মাহমুদকে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান করা হয়েছে। যারা নিজেরা নির্বাচনে অংশ নেবেন না, তাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন কার্যক্রম সমন্বয়ের গুরু দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। পাশাপাশি তাকে দলের নীতি নির্ধারণী কমিটিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধানের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি জানান, ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচন করার কারণে দায়িত্বে থাকা সমীচীন হবে না— সেই বিবেচনায় তিনি পদ ছাড়ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই সাবেক ছাত্র উপদেষ্টার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনীতিতে ছাত্র নেতৃত্বের অবস্থান ও সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। আন্দোলনের সময় যাদের নেতৃত্বে রাজপথ মুখর ছিল, জোট রাজনীতির বাস্তবতায় এসে তাদের আদর্শিক অবস্থান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে জোট ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক— এমন ধারণা থেকেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এই সিদ্ধান্ত একদিকে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির ভেতরের মতপার্থক্য ও সংকটকে স্পষ্ট করেছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পথ কতটা জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ— সেটিও সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনের বাইরে থেকে আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম কীভাবে রাজনৈতিক ভূমিকা রাখেন এবং অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনীতিতে ছাত্র নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোয়।