প্রকাশ :: ... | ... | ...

বদলাচ্ছে বৃষ্টির ধরন, পাল্টাচ্ছে বন্যার ভূগোল


সংযুক্ত ছবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বন্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু সাত জেলার বন্যা নয়; বরং বৃষ্টিপাতের ধরন এবং বন্যাপ্রবণ এলাকার পরিবর্তন। নতুন শঙ্কা ‘নগর বন্যা’, সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে বর্ষা মানেই নদীভাঙন, উজানের ঢল কিংবা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা—এমন চিত্র বহুদিনের পরিচিত। কিন্তু এবার সেই চেনা দৃশ্যপট বদলে গেছে। একই সময়ে দেশের এক অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল, অন্যত্র ভয়াবহ বন্যা, আবার বড় শহরগুলোতে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের বৃষ্টিপাতের ধরন ও বন্যার ভূগোল বদলে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। এবারের বর্ষায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। একই সময়ে রাজধানী ঢাকাও দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে পড়ে। ফলে নদীভিত্তিক বন্যার পাশাপাশি নতুন বাস্তবতা হিসেবে সামনে এসেছে ‘নগর বন্যা’ (Urban Flooding)। রেকর্ড বৃষ্টিপাত, অচল নগরজীবন আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই চট্টগ্রামে একদিনে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা গত চার দশকের মধ্যে শহরটির সর্বোচ্চ একদিনের বৃষ্টিপাত। পরবর্তী কয়েক দিনেও টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর এক সপ্তাহ পর রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে চলে যায়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে, অফিসফেরত মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে এমন পরিস্থিতি মূলত নদী উপচে পড়ার কারণে তৈরি হলেও এখন অল্প সময়ের অতিভারি বৃষ্টিতেই নগরজীবন অচল হয়ে পড়ছে। সাত জেলায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় সাত জেলার ৫৯টি উপজেলা, ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সরকারি হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। সেখানে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙ্গামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন নিহত হয়েছেন। কেন বদলে যাচ্ছে বন্যার চিত্র? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, এবারের দুর্যোগের মূল কারণ ছিল বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপ, যা বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নিয়ে আসে। তার মতে, এখন বাংলাদেশে তিন ধরনের বন্যা একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে— নদীর পানি উপচে সৃষ্ট বন্যা, পাহাড়ি ঢলের আকস্মিক বন্যা (Flash Flood), এবং নগর বন্যা (Urban Flooding)। তিনি বলেন, “আগে যেখানে বৃষ্টির ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পানি মাটির নিচে চলে যেত, এখন নগরায়নের কারণে প্রায় পুরো পানিই ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।” নগর বন্যা কেন বাড়ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, অপরিকল্পিত নগরায়নও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বিভিন্ন শহরে— খাল ও জলাধার ভরাট, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থাপনা- একত্রে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, “ড্রেন, খাল ও নালা আবর্জনায় ভরে থাকায় অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত পানি সরানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভারী বৃষ্টির পর শহরগুলো কার্যত পানির নিচে চলে যাচ্ছে।” চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ কর্ণফুলী নদীতে জোয়ারের সময় স্লুইসগেট বন্ধ রাখতে হয়। তখন শহরের পানি বের হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, এবার জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ের শুরুতেই কয়েক দফা অতিভারি বর্ষণ সেই ঘাটতি পূরণ করে দেয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, এখন দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে অতিভারি বর্ষণের প্রবণতা বাড়ছে। সাউথ এশিয়ান মিটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মোট মৌসুমি বৃষ্টিপাত খুব বেশি না বাড়লেও চরম মাত্রার বৃষ্টিপাত (Extreme Rainfall Events) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তার মতে, এর পেছনে ভারত মহাসাগরীয় ডাইপোল (IOD), মৌসুমি বায়ুর পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সমন্বয়ের অভাব বড় সমস্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর অনেক সময় নির্ভুল পূর্বাভাস দিলেও তা বাস্তব প্রস্তুতিতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ফলে আগাম সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়া কিংবা ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রস্তুত করার মতো কার্যকর উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। কী করা জরুরি? বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। এজন্য প্রয়োজন— লোকেশনভিত্তিক ও আরও নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস; নগর বন্যার জন্য পৃথক পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু; খাল, নদী ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ; আধুনিক ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ; কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা; বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা; এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা। নতুন বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বর্ষা একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—বাংলাদেশে বন্যার চরিত্র বদলে যাচ্ছে। নদীভিত্তিক বন্যার পাশাপাশি নগর বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও স্বল্প সময়ে অতিভারি বর্ষণ এখন নিয়মিত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। তাদের সতর্কবার্তা, এখনই যদি নগর পরিকল্পনা, জলাধার সংরক্ষণ, ড্রেনেজ আধুনিকায়ন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের বড় শহরগুলো আরও ঘন ঘন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যার মুখোমুখি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন বাস্তবতায় টেকসই নগর পরিকল্পনা ও সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।