প্রকাশ :: ... | ... | ...

বহুবিপদে ইলিশ, কমছে উৎপাদন-আকার-সরবরাহ


সংযুক্ত ছবি

দুই বছরে উৎপাদন কমেছে ৭১ হাজার টন; ছোট হচ্ছে গড় আকার, কমছে খাদ্য প্ল্যাংকটন—নদীর নাব্যতা, দূষণ, অতিরিক্ত আহরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে চাপ ভরা মৌসুমে যে ইলিশের সরবরাহ বাড়ার কথা, বাজারে এখন তার উল্টো চিত্র। দেশের বিভিন্ন মাছের বাজারে ইলিশের জোগান প্রত্যাশার তুলনায় কম। ফলে জাতীয় মাছটির দামও থাকছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের একটি ইলিশ কিনতে ঢাকার বাজারে গুনতে হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার টাকা বা তারও বেশি। কিন্তু ইলিশের এই সংকট শুধু বাজারদর কিংবা সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছরের উৎপাদন, মাছের গড় আকার, নদী-সাগরের পরিবেশ এবং ইলিশের জীবনচক্রের ওপর গবেষণা ও সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ বলছে, জাতীয় মাছটি একাধিক চাপের মধ্যে রয়েছে। কমছে মোট উৎপাদন। কমছে বড় আকারের ইলিশ। ইলিশের খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাংকটনের পরিমাণ কমছে। নদীর নাব্যতা সংকুচিত হওয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক যাত্রাপথ। নদীতে জাটকা আহরণ এবং সাগরে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত চাপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের এই সংকটকে কোনো একক কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। বরং একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করায় উৎপাদন ও মাছের আকার—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। দুই বছরে কমেছে ৭১ হাজার টন মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প নেওয়ার সময় দেশে বছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। পরবর্তী দুই অর্থবছরে উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও সর্বশেষ দুই অর্থবছরে আবার নিম্নমুখী হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয় প্রায় ৫ লাখ ৪ হাজার টন। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব এখনও পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই অর্থবছরেও উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে থাকতে পারে। ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিনও। গত এপ্রিলে চাঁদপুরের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশে একসময় প্রচুর ইলিশ উৎপাদন হলেও বিভিন্ন কারণে এখন উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। শুধু মাছ কমছে না, ছোটও হচ্ছে ইলিশের সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মাছের গড় আকারও কমে আসছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ছিল **১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি**। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চিতে। অঞ্চলভেদেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে ছোট গড় আকারের ইলিশ পাওয়া গেছে রাজশাহীতে—**১১ দশমিক ৪২ ইঞ্চি**। বিপরীতে কক্সবাজারে পাওয়া ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য **১৫ দশমিক ১৬ ইঞ্চি**। জেলেদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের পরিবর্তনের কথা বলছে। কুয়াকাটার মহিপুর মৎস্য বন্দরের জেলে নাজিম আহমেদের ভাষ্য, আগে ছোট ইলিশেরও প্রায় আধা কেজি ওজন থাকত। এখন অনেক ছোট আকারের মাছ ধরা পড়ছে; ছয়টি ইলিশ মিলিয়েও এক কেজি হয়। ইলিশ গবেষক ও মৎস্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. আনিসুর রহমান বলেন, গত দুই বছরে সামগ্রিক উৎপাদন কমার পাশাপাশি বড় আকারের ইলিশের পরিমাণও কমেছে। একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রামের মধ্যে থাকলেও এখন তা প্রায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে। এই পরিবর্তনকে শুধু মাছের আকারের সমস্যা হিসেবে দেখছেন না গবেষকরা। এর সঙ্গে ইলিশের খাদ্য, পরিবেশ, আহরণ পদ্ধতি ও জীবনচক্রের সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য কমছে মেঘনায় ইলিশের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদকণা ও প্রাণিকণা বা প্ল্যাংকটন রয়েছে। এগুলো মাছের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেঘনা নদীতে ইলিশের খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাংকটনের পরিমাণ প্রায় ৬৮ শতাংশ কমেছে। গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের মতে, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। এর প্রভাব পড়ছে ইলিশের বৃদ্ধিতে। পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়ায় মাছ দ্রুত বড় হতে পারছে না এবং বড় হওয়ার আগেই জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। প্ল্যাংকটন কমে যাওয়ার বড় কারণ হিসেবে নদীদূষণকে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। ফলে একটি ধারাবাহিক সংকট তৈরি হচ্ছে—নদীদূষণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে খাদ্য কমছে, খাদ্য কমায় ইলিশের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, আর একই সময়ে অল্প বয়সেই মাছ আহরণ করা হচ্ছে। জীবনচক্র পূর্ণ হওয়ার আগেই আহরণ ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সমুদ্র—দুই পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ডিম ছাড়ার জন্য ইলিশ নদীতে আসে। ডিম ফুটে ছোট মাছ নদীতে কিছুটা বেড়ে ওঠে। এরপর সাগরে গিয়ে পরিণত হয়। আবার প্রজননের জন্য নদীতে ফিরে আসে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় নদী ও সমুদ্রের মধ্যে ইলিশের অবাধ চলাচল প্রয়োজন। বরিশালের হিজলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমের মতে, একটি ইলিশের এক থেকে দেড় কেজি ওজন হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত আহরণের কারণে অনেক মাছ সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে না। নদীতে জাটকা ধরা পড়ছে। অন্যদিকে সাগরে ট্রলিং জাহাজের মাধ্যমে মাছ আহরণ হচ্ছে। ফলে ইলিশের জীবনচক্র সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তা খাদ্যশৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের জেলে লিটনের ভাষ্যও একই ধরনের। মাছ কমে যাওয়ায় শিকারের খরচ তুলতে জেলেরা ছোট মাছ ও রেণুও ধরতে বাধ্য হচ্ছেন বলে তিনি জানান। ইলিশের পথও সংকুচিত ইলিশ শুধু মাছ নয়, এটি একটি পরিযায়ী প্রজাতি। তাই তার চলাচলের পথ নিরাপদ ও সচল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সাংহাই ওশান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক কিশোর কুমার সরকারের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে বড় বাধা তৈরি করছে। সমুদ্র থেকে নদীতে কিংবা নদী থেকে সমুদ্রে যাওয়ার যে মাইগ্রেশন চ্যানেল ইলিশ ব্যবহার করে, সেখানে ডুবোচরের সংখ্যা বেড়ে গেলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। নদীর নাব্যতা কমে গেলে শুধু নৌযান চলাচলই ব্যাহত হয় না; এর প্রভাব পড়ে নদীর জলজ জীববৈচিত্র্য ও মাছের চলাচলের ওপরও। ইলিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার জীবনচক্রই নদী ও সমুদ্রের মধ্যে চলাচলের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ ইলিশের জন্য শুধু প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করলেই হবে না; সেই প্রজননক্ষেত্রে যাওয়ার পথও নিরাপদ রাখতে হবে। সাগরে অতিরিক্ত আহরণ, নদীতে সংরক্ষণ ইলিশ সংরক্ষণে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ বলেন, ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম মূলত নদীকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু সাগরে অতিরিক্ত আহরণের বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার মতে, নদীতে নাব্যতা সংকট বাড়ছে এবং আগের মতো পানি নেই। ফলে ইলিশের যাত্রাপথ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমুদ্রে ইলিশ রক্ষায় কয়েকটি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে রক্ষা করা যায়নি। এখানেই ইলিশ ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— ইলিশের জীবনচক্র যদি নদী ও সমুদ্র উভয় জায়গায় বিস্তৃত হয়, তাহলে সংরক্ষণ ব্যবস্থা কেন শুধু একটি অংশকে ঘিরে থাকবে? জেলেদের প্রণোদনা নিয়েও প্রশ্ন ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হলে বিকল্প জীবিকা ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু জেলেদের তালিকা হালনাগাদ না থাকা এবং প্রণোদনা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। হিজলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জেলেদের তালিকা হালনাগাদ না হওয়ায় প্রকৃত জেলেদের বড় একটি অংশ প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও অনেকে প্রণোদনার বাইরে থাকছেন। প্রণোদনা ব্যবস্থা যদি প্রকৃত জেলেদের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের জীবিকা চালানোর চাপ বাড়বে। আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার প্রবণতা বাড়াতে পারে। তাই ইলিশ রক্ষার সঙ্গে জেলেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। দুই বছর ধরে কমছে উৎপাদন ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তরের পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ২২৯ কোটি টাকা। প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা এবং জাটকা ও মা ইলিশ আহরণকারী ৩০ হাজার জেলে পরিবারের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও উৎপাদন কমার প্রবণতা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই ইলিশ ব্যবস্থাপনার কাজ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। নদী ও সমুদ্রের পরিবেশের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন, মাছের চলাচলের পথ, আহরণের ধরন—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। বাজারে কেন এত দাম? ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন কমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও এটিই একমাত্র কারণ নয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষায় মাছ আহরণের খরচ বৃদ্ধি, হিমাগারে সংরক্ষণ, রপ্তানির অনুমতি এবং নদীর মোহনায় ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরবরাহ শৃঙ্খল। সমীক্ষা অনুযায়ী, একটি ইলিশ ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগে **চার থেকে ছয়বার পর্যন্ত হাতবদল** হয়। প্রতিটি পর্যায়ে দাম বাড়ে। ফলে নদী বা সাগর থেকে কম দামে ওঠা ইলিশ বাজারে পৌঁছানোর সময় অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারী মানিক জমাদারের বক্তব্যেও সরবরাহ ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট। তার মতে, অন্যান্য বছর ভরা মৌসুমে প্রতিদিন যেখানে এক হাজার থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ কেনাবেচা হতো, এবার সেখানে ১০০ মণ ইলিশও পাওয়া যাচ্ছে না। সরবরাহ কমলে বাজারে দাম বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক নিয়ম। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহের এই ঘাটতি যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে ইলিশ ক্রমেই সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে দূরে সরে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন ঝুঁকি ইলিশের সংকটকে শুধু মাছ ধরা বা সংরক্ষণের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। কিশোর কুমার সরকারের মতে, গত কয়েক দশকে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে। পানির তাপমাত্রা মাছের বৃদ্ধি, চলাচল ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে। ইলিশ যেহেতু নদী ও সমুদ্রের মধ্যে পরিযান করে, তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তার ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়তে পারে। তাপমাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে নদীর প্রবাহ, বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা ও সমুদ্রের পরিবেশের পরিবর্তনও যুক্ত হতে পারে। এসব পরিবর্তন ইলিশের খাদ্য, প্রজননক্ষেত্র ও চলাচলের পথকে প্রভাবিত করলে তার সামগ্রিক উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে ইলিশ সংরক্ষণের পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনকে আলাদা একটি বিষয় হিসেবে নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। বিলুপ্তির আশঙ্কা কতটা? ইলিশ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—এই প্রবণতা কোথায় গিয়ে থামবে? সাংহাই ওশান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক কিশোর কুমার সরকার চীনের ইয়াংজী নদীর ‘চাইনিজ শ্যাড’-এর উদাহরণ টেনেছেন। ইলিশের সঙ্গে একই গোত্রের ওই মাছ অতিরিক্ত আহরণের কারণে ১৯৯০-এর দশকে কার্যত হারিয়ে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার আশঙ্কা, প্রজননস্থলে প্রবেশের হার কমে যাওয়া, ব্যাপকভাবে মা ইলিশ আহরণ এবং অপ্রাপ্ত বয়সে মাছ প্রজননে সক্ষম হয়ে ওঠার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে ‘ক্যাসকেড ইফেক্ট’ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তা ইলিশের মজুদের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমান এখনই বিলুপ্তির মতো তীব্র সংকট দেখছেন না। তার মতে, উৎপাদন কমার কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নেওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে দুজনের বক্তব্যের মধ্যেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে— ইলিশের বর্তমান প্রবণতাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কী করতে হবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ রক্ষায় এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমন্বিত গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা। আনিসুর রহমানের মতে, ইলিশের গড় আকার কেন কমছে, উৎপাদন কেন কমছে—এসব বিষয়ে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন। প্রচলিত সংরক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজন হলে আইন পরিবর্তন করে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কিশোর কুমার সরকার কৃত্রিম প্রজননের ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, টেকসই মজুদ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাপনায় ইলিশের কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা প্রয়োজন। ভারত এ ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার আরও সুপারিশ—আধুনিক মলিকুলার প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন অভয়াশ্রম চিহ্নিত করা, অভয়াশ্রমে কঠোর নজরদারি, নির্দিষ্ট আকারের নিচের মাছ যাতে জালে না ওঠে সে অনুযায়ী জালের মাপ নির্ধারণ এবং নদীর নাব্যতা সংকটের সমাধান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ইলিশের বিচরণক্ষেত্র কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের জলসীমা ও নদী-অববাহিকার সঙ্গে ইলিশের চলাচল যুক্ত। তিন দেশেই ইলিশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই ইলিশ সংরক্ষণে তিন দেশের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইলিশ রক্ষায় এখনই সিদ্ধান্তের সময় ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু জাতীয় প্রতীকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লাখো জেলে পরিবার, মৎস্য ব্যবসা, নদী ও উপকূলীয় অর্থনীতি এবং দেশের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে ইলিশ সরাসরি যুক্ত। আজকের সংকট তাই শুধু বাজারে ইলিশের দাম বেড়ে যাওয়ার সংকট নয়। এটি নদী ও সাগরের পরিবেশের সংকট, জেলেদের জীবিকার সংকট এবং একটি পরিযায়ী মাছের জীবনচক্র টিকিয়ে রাখার সংকট। উৎপাদন কমছে, বড় মাছ কমছে, খাদ্য কমছে, নদীর পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং মাছ জীবনচক্র সম্পূর্ণ করার আগেই আহরণ হচ্ছে—এসব প্রবণতা একই সঙ্গে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাই ইলিশ সংরক্ষণে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না। প্রয়োজন নদী-সাগরভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা, কার্যকর প্রণোদনা, কঠোর আইন প্রয়োগ, নাব্যতা রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ইলিশকে বাঁচাতে হলে শুধু মাছটিকে রক্ষা করলেই হবে না; ইলিশের নদী, সাগর, খাদ্য, প্রজননক্ষেত্র এবং যাত্রাপথ—পুরো বাস্তুতন্ত্রকেই রক্ষা করতে হবে। কারণ ইলিশের সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু একটি মাছের সংকট নয়—এটি বাংলাদেশের নদী ও সমুদ্রের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তারও একটি সতর্কবার্তা।