প্রকাশ :: ... | ... | ...

বাংলাদেশ নিয়ে চীন-ভারতের যতটা আগ্রহ, যুক্তরাষ্ট্রের ততটা নেই


সংযুক্ত ছবি

বাংলাদেশকে ঘিরে চীন ও ভারতের যে মাত্রার আগ্রহ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সে মাত্রার আগ্রহ নেই বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টাইন ফেয়ার। তাঁর মতে, বাংলাদেশে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে থামাতে পারবে না। শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের একটি অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘Power and Prudence: Managing Great-Power Competition without Conflict’ শীর্ষক ওই আলোচনায় বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান, বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশনে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান, সাবেক ভারতীয় সেনা কমান্ডার অরুণ কুমার সাহনি এবং তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান তুরানও অংশ নেন। বাংলাদেশকে ঘিরে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্যারল ক্রিস্টাইন ফেয়ার বলেন, বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের মধ্যে বাংলাদেশকে ঘিরে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। চীন বা ভারতের বাংলাদেশ নিয়ে যে মাত্রার আগ্রহ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের তা নেই। তিনি বলেন, এর পেছনে বড় কারণ হলো দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশে বিনিয়োগের মতো চীনের যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সে পরিমাণ সম্পদ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে—এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে উল্লেখ করে মার্কিন এই অধ্যাপক বলেন, তিনি বাস্তবে সে ধরনের প্রতিযোগিতা দেখছেন না। বরং তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, এই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই পিছিয়ে যাচ্ছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফেয়ার বলেন, তাঁর মনে হয় না যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে থামাতে পারবে। বাংলাদেশ নিজের স্বার্থের জন্য যা সবচেয়ে ভালো মনে করবে, সেটিই করবে—এমন বার্তাই আলোচনায় পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কৌশলগত স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য একক কোনো পক্ষের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে—তাঁর বক্তব্যে এমন বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। একই অধিবেশনে তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান তুরানকে বাংলাদেশের ‘মক্কা প্যাক্টে’ যুক্ত হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের এ বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে বলে তিনি জানেন। তবে বর্তমানে তিনি তুরস্ক সরকারের হয়ে কাজ করেন না এবং অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ বা তুরস্কের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করতে চান না। তুরান বলেন, তিনি এখন তুরস্ক সরকারের কোনো দায়িত্বে নেই। ফলে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা এ ধরনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও তুরস্ক কী সিদ্ধান্ত নেবে, সে বিষয়ে মন্তব্য করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে বলে তিনি জানেন। আলোচনায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও উঠে আসে। তুরান বলেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলতে শুধু মাঝখানে বসে থাকা বোঝায় না। বরং নিজের কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই এর অর্থ। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও বিভক্ত। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি উদীয়মান মধ্যম শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করছে। সাবেক ভারতীয় সেনা কমান্ডার অরুণ কুমার সাহনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি দুটি—সামরিক দিক থেকে সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক আস্থা। আলোচনাটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যপথ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা দেশটিকে বড় শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে আলোচনায় বক্তাদের বক্তব্যে বাংলাদেশের জন্য কোনো নির্দিষ্ট শক্তির সঙ্গে অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে নিজস্ব স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।