প্রকাশ :: ... | ... | ...

বারে মদ্যপান, প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীর মাঠে যান


সংযুক্ত ছবি

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য তদন্তে তাঁর জীবনের শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছেন বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দীপের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরার একটি বারে মদ্যপান ও প্রেমিকা জারিকা তাসনিম দিশার সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন সেবনের উদ্দেশ্যে তাঁরা টঙ্গীর একটি মাঠে যান। সেখানে মাদক সেবনের সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দীপ পালিয়ে গেলেও তাহসিফের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবে তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পড়ে মারা গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। দীপের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনের তথ্য যাচাই করে প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের আলামত পাওয়া যায়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু কেউ তাঁকে পানিতে পড়তে দেখেছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন অপেক্ষা করছেন তদন্তকারীরা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটের দিকে তাহসিফ, দিশা ও দীপ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে প্রবেশ করেন। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার কয়েক দিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিলেন এবং ওই যুবকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল বলে তাহসিফ জানতে পারেন। এ নিয়ে তাহসিফের মন খারাপ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই সেদিন বারে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে দীপের বক্তব্য। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বারে ঢোকার পর তাহসিফ বিষণ্ন সংগীত বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে তাঁরা মদ্যপান করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ ও দিশার পাশাপাশি দীপও মদ পান করেন। এ সময় দিশার সঙ্গে অন্য এক যুবকের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে তাহসিফ প্রশ্ন তুললে তাঁদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ বলেন, দিশা ইয়াবা সেবন করে থাকলে তিনি এর চেয়েও বড় কিছু—হেরোইন—সেবন করবেন। রাত ১২টার দিকে তিনজন বার থেকে বের হন। পরে তাহসিফ মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফ ও দিশার মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে সম্পর্ক ছিল। তাঁদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে একসঙ্গে বিভিন্ন বার ও রেস্তোরাঁয় যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দিশাকে পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গী বাজারের বস্তিসংলগ্ন একটি মাঠের দিকে রওনা হন। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন। মাঠের পাশে বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে তাঁরা ভেতরে যান। তখন সেখানে আরও অনেক মানুষ ছিলেন, যাঁদের বেশির ভাগকে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারি বলে বর্ণনা করেছেন দীপ। দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঠে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে হেরোইন আছে কি না জানতে চান এবং প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়ার কথা বলেন। এরপর কয়েকজন তাঁদের কাছে আসেন। তাঁদের কাছ থেকে মাদক কিনে তাহসিফ সেবন করেন বলে দাবি করেছেন দীপ। বারে মদ্যপানের পর মাদক সেবনের কারণে তাহসিফ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেও জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন তিনি। এসব তথ্য এখনো তদন্তে যাচাইয়ের বিষয়। পুলিশের উপস্থিতিতে পালিয়ে যান দীপ দীপের দাবি, তাহসিফ যখন মাঠে মাদক সেবন করছিলেন, তখন পুলিশের একটি টহল দল সেখানে আসে। পুলিশকে দেখে স্থানীয় লোকজনের অনেকে পালিয়ে যান। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান এবং ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকিয়ে থাকেন। এ সময় তাহসিফের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। দীপ জানান, দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে দেখতে পান। তাঁরা নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি নিজের নাম এবং মোহাম্মদপুরের ঠিকানা জানান। তখন তিনি নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দিয়ে বলেন, একটি কাজে সেখানে এসেছেন। পুলিশ তাঁকে এত রাতে সেখানে না থেকে বাসায় চলে যেতে বলেছিল বলে তাঁর দাবি। তবে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ মেনে তাঁদের সঙ্গে না গিয়ে দীপ বস্তির একটি সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। রাস্তা চিনতে না পেরে এক ব্যক্তির সহায়তায় পরে মূল সড়কে পৌঁছান। এরপর নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে ফিরে এসে তাহসিফের ফোনে একাধিকবার কল করেন। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন তিনি। দীপের ভাষ্য, তাহসিফ হেরোইন সেবনের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন বলে তিনি ধারণা করেছিলেন, মাদক সেবন শেষ না করে তাহসিফ চলে যাবেন না। এর আগে তাহসিফ তাঁর কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন। তাই ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে বলেও মনে করেছিলেন তিনি। তাহসিফ পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবেন—এমন ধারণা থেকে পরে নিজের মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন বলে দাবি করেছেন দীপ। তিনি তাহসিফকে পানিতে পড়তে দেখেননি বলেও জানিয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। বারসহ বিভিন্ন স্থানের তথ্য এবং দুজনের মোবাইল ফোনও যাচাই করা হয়েছে। তাহসিফের মরদেহে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকা এবং দীপের বক্তব্য বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তাহসিফ ঠিক কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। দীপের বক্তব্যেও বিভিন্ন সময়ে ভিন্নতা পাওয়া গেছে বলে তদন্তে তা আরও যাচাই করা প্রয়োজন। ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার অপেক্ষা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে ময়নাতদন্তের সময় পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রক্ত ও ভিসেরাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, মরদেহটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। পানিতে ডুবেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। মাদক বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ কিংবা বিষ প্রয়োগের বিষয়টিও পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে যাচাই করা হবে। তাহসিফ বিমানবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন বলে তাঁর সাঁতার জানা থাকার সম্ভাবনার বিষয়টিও বিবেচনায় আসছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। তবে পানিতে পড়ার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, তিনি সাঁতার কাটতে সক্ষম ছিলেন কি না কিংবা অন্য কোনো পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন কি না—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তাহসিফের মায়ের কাছে তাঁর ফোন থেকে পাঠানো শেষ ভয়েস মেসেজ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাত ১টার দিকে পাঠানো ওই বার্তায় বলা হয়েছিল, ‘রওনা দিসি আসতেছি’। বার্তাটি কে পাঠিয়েছিলেন, তখন তাহসিফের সঙ্গে কে ছিলেন এবং তিনি নিজেই বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পাশাপাশি দীপ ও দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। যেভাবে সামনে আসে মৃত্যুর ঘটনা গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে দীপের ডাকে বের হয়েছিলেন ২৮ বছর বয়সী তাহসিফ। তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন, কিন্তু আর ফেরেননি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর আসে। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানায়। ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। প্রথমদিকে দীপ দাবি করেছিলেন, রাতের খাবার খেয়ে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। পরে টঙ্গীর মাঠে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমদিকে মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করলেও ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এজাহারে তিনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পরে দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তাহসিফের বাবা সাংবাদিকদের বলেছেন, দীপ প্রথমে তাঁকে জানিয়েছিলেন, ছেলেকে বাসার কম্পাউন্ডে নামিয়ে দিয়েছেন। পরে টঙ্গীতে যাওয়ার কথা স্বীকার করায় তাঁর সন্দেহ তৈরি হয়। নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুনও এর আগে জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। রোববার, ১ নভেম্বর, ঘটনার রাতে তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে নেস্ট বারে যাওয়া তরুণী জারিকা তাসনিম দিশাকে কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তাঁর সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ ও তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে তাঁদের যোগাযোগ এবং ঘটনার রাতে একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তাহসিফের শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে দীপের বক্তব্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও তা এককভাবে মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করে না। পুলিশের উপস্থিতিতে পালিয়ে যাওয়ার পর তাহসিফ কোথায় ছিলেন, কীভাবে নদীতে পড়লেন এবং তাঁর মৃত্যুর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা, ডিজিটাল তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাইয়ের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।