বিএফআইইউর চিঠিতে হিসাব খোলার নথি ও লেনদেনের বিবরণ চাওয়া হয়েছে; স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় পুলিশের ভাষ্য, বিরোধের সূত্র জমি কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় তাঁর ব্যবহৃত ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে এ উদ্যোগের খবর প্রকাশ্যে আসে। ব্যাংক হিসাব তলবের ঘটনায় বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন সালমান। তবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে সালমান বলেন, ‘আমি যখন ভুক্তভোগী হিসেবে প্রশ্ন করলাম, তখন কেন আপনার (সরকার) ব্যাংক হিসাব তলব করার কথা মনে হলো? অবশ্যই, যা করবেন করেন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে।’ ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তিপত্র লাগবে দিলাম। লেটার লাগবে দিলাম। ট্রানজেকশন লাগবে দিলাম। এগ্রিমেন্ট লাগবে দিলাম। অংশীদারিত্ব লাগবে দিলাম। তারপর আর কী করবেন?’ মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘মামলা কী ফেসবুকে এসে দেব? মামলা তো বহুত হয়েছে। কয়টা সামলেছেন আপনারা?’ সালমানের বক্তব্যের আগে বুধবার দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠিয়ে তাঁর ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য চায় বিএফআইইউ। চিঠিতে হিসাব খোলার ফরম, গ্রাহকের পরিচিতি-সংক্রান্ত তথ্য বা কেওয়াইসি নথি এবং হিসাবের লেনদেন বিবরণীসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে বলা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তথ্যগুলো জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলবের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। বিএফআইইউর এ ধরনের তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের দায়িত্বের অংশ। শুধু হিসাবের তথ্য চাওয়া থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সালমানের ক্ষেত্রেও ব্যাংক হিসাব তলবের সঙ্গে কোনো অপরাধের যোগসূত্র আছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ঘটনাটির পটভূমিতে রয়েছে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ আবাসন এলাকায় তাঁর ব্যবহৃত ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে স্টুডিওটিতে একদল ব্যক্তি ঢুকে বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি প্রথমে বিএনপির লোকজনের বিরুদ্ধে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। পরে অবশ্য জানান, সরাসরি কেউ তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেনি। হামলার কারণ নিয়ে সালমানের অভিযোগের সঙ্গে পুলিশের বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরে বলেছিলেন, নিউ গিনি প্রপার্টিজ ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ জমির দখল নিতে যাওয়া একটি দলের তৎপরতার সময় সালমানের ব্যবহৃত স্থাপনাসহ কয়েকটি কাঠামোতে ভাঙচুর হয়। এটি প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দেওয়া বক্তব্য; জমির মালিকানা ও বিরোধের সব দিক চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশও হামলার ঘটনাকে চাঁদাবাজির বদলে জমিসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সেখানে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি এবং স্টুডিওটি হামলাকারীদের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল না। অন্যদিকে, সালমানের অভিযোগ ও তাঁর পরবর্তী বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। অভিযোগ, প্রাথমিক তদন্তের বক্তব্য এবং প্রমাণিত তথ্যকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। হামলার ঘটনায় পুলিশ মামলা করেছে এবং চারজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত, প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ভূমিকা এবং তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে হামলার পেছনে কারা ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং জমিসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে প্রত্যেকের কী ধরনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। ব্যাংক হিসাব তলবের খবর প্রকাশের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনেও বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন। তবে সেখানে বিএফআইইউর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার কথা জানান। ফলে হিসাব তলবের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ, লেনদেন বা তদন্ত রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সালমান মুক্তাদির বাংলাদেশের পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের একজন। ইউটিউবের পাশাপাশি অভিনয়, সংগীত, বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যিক ভিডিও নির্মাণের সঙ্গেও তিনি যুক্ত। তাঁর ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার ঘটনা এবং স্টুডিওতে হামলার বিষয়টি অল্প সময়ের ব্যবধানে সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ অবস্থায় দুটি বিষয়ই আলাদাভাবে স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একদিকে স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া; অন্যদিকে ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কারণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা। তদন্তের ফল ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনাগুলোর প্রকৃত যোগসূত্র সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।