প্রকাশ :: ... | ... | ...

ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙলেন এনসিপি নেতারা


সংযুক্ত ছবি

কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগর পাড়ে ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাসভবন সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবিতে শুক্রবার রাতে বাড়িটির সামনে তাঁর নাতনি আরমা দত্তের ঝোলানো সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতাকর্মীরা। বাড়িটি বিক্রির চেষ্টা ঠেকাতেই সাইনবোর্ড ভাঙা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা। তবে এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন আরমা দত্ত। তিনি বাড়িটিকে তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি এবং নিজেকে এর বৈধ ওয়ারিশ দাবি করেছেন। সাইনবোর্ড ভাঙার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাড়িটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি সম্পত্তির ওয়ারিশ দাবি করে বাড়িটির সামনে সাইনবোর্ড ঝোলান আরমা দত্ত। তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে। সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’ এনসিপির নেতাদের দাবি, বাড়িটি বিক্রির প্রচেষ্টা চলছে এবং এ উদ্দেশ্যে সেখানে সাইনবোর্ড ঝোলানোর পাশাপাশি পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়ি বিক্রি প্রতিহত করতেই তাঁরা সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেছেন। তবে বাড়ি বিক্রির চেষ্টা বা পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা বাড়িটির সামনে গিয়ে প্রথমে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে তাঁরা সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন। রাতে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করার কথাও জানায় দলটি। রাত ১০টার দিকে মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ‘আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাবো। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’ অন্যদিকে আরমা দত্ত বলেন, ‘এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করব, রাখব না বিক্রি করব, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করব।’ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড কে ভেঙেছে, সে বিষয়ে এখনো কেউ তাঁকে অবহিত করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে। সংরক্ষণের উদ্যোগ হয়নি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাড়িটির জরাজীর্ণ অবস্থার কথা তুলে ধরে বলা হয়, ২০১০ সালে বাড়িটি পরিদর্শনের পর সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বাড়ির তিনটি ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পত্তির মালিকানা বজায় রেখে সংরক্ষণের বিষয়ে বিকল্প প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করা হয়। চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর বাসসের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি সংরক্ষণ ও তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কুমিল্লায় একটি স্মৃতি সংরক্ষণ ও পাঠাগার বাস্তবায়ন পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর নামে পাঠাগার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুক কর্নার, স্মরণিকা প্রকাশ এবং জন্মবার্ষিকী পালনের কর্মসূচির পাশাপাশি ঝাউতলাস্থ বাসভবন সংস্কার ও সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগ কামনা করা হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে পরিষদের কাজে ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ছিলেন।