প্রকাশ :: ... | ... | ...

মাইক্রোপ্লাস্টিক, ভারী ধাতু ও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি; বাজারের অর্ধেক মাছের নমুনায় সালমোনেলা


সংযুক্ত ছবি

ছবি : সংগৃহীত

পুকুরের চাষের মাছ থেকে শুরু করে রাজধানী ও আশপাশের বাজারে বিক্রি হওয়া মাছ—খাদ্য হিসেবে পরিচিত এই পণ্যটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে একাধিক গবেষণা। ময়মনসিংহের ত্রিশালের বাণিজ্যিক মাছের পুকুরের পলি ও মাছের পরিপাকতন্ত্রে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। একই এলাকার মাছের খামারে করা পৃথক গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে সীসা ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু এবং অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি। অন্যদিকে সাভার ও মানিকগঞ্জের বাজার থেকে সংগ্রহ করা মাছের প্রায় ৪৭ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে খাদ্যবাহিত রোগ সৃষ্টিকারী সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া। শনাক্ত জীবাণুর উল্লেখযোগ্য অংশ একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। গবেষণাগুলোতে উঠে আসা এসব তথ্য দেশের মাছ উৎপাদন, বিপণন ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই মাছ খাওয়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে মাছের চাষ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ২৫টি বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরের পলি এবং ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। মাছের পরিপাকতন্ত্রে পাওয়া এসব কণার গড় পরিমাণ প্রতি মাছে শূন্য দশমিক ৬০টি। প্রজাতিভেদে সবচেয়ে বেশি কণা মিলেছে সরপুঁটিতে—প্রতি মাছে গড়ে ১ দশমিক ২০টি। রুই ও মৃগেলে পাওয়া গেছে গড়ে শূন্য দশমিক ৬৮টি করে কণা। পুকুরের পলির সব নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট-ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের গবেষণাপত্রটি গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন’-এ প্রকাশিত হয়। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মো. বদিউজ্জামান খান। তাঁর ভাষ্য, মাছের পরিপাকতন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেও তা দিয়ে সরাসরি মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। কারণ মানুষ সাধারণত মাছের পরিপাকতন্ত্র খায় না। তবে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা অনেক সময় ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান বহন করতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার দাবি রাখে। অধ্যাপক বদিউজ্জামান জানান, ত্রিশালের একই এলাকার মাছের খামারে করা আরেকটি গবেষণায় ক্রোমিয়াম ও সীসার মতো ভারী ধাতুর পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে। ফলে এসব উপাদানের সুনির্দিষ্ট মাত্রা, উৎস ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি বাজারের মাছেও পাওয়া গেছে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক জীবাণু। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা এক গবেষণায় সাভার ও মানিকগঞ্জের বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৩৪২টি মাছের নমুনার মধ্যে ১৬২টিতে সালমোনেলা শনাক্ত হয়েছে। নমুনার ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দুই এলাকার বাজার থেকে রুই, পাঙাশ ও তেলাপিয়া মাছ সংগ্রহ করে গবেষণাটি করা হয়। প্রতিটি মাছের অন্ত্র ও ত্বক থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষার পর সবচেয়ে বেশি সালমোনেলা পাওয়া যায় রুইয়ে। ১১৪টি রুইয়ের মধ্যে ৯০টিতে, অর্থাৎ ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ নমুনায় ব্যাকটেরিয়াটি শনাক্ত হয়। পাঙাশে এ হার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং তেলাপিয়ায় ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। সাভারে সংক্রমণের হার ছিল ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ, মানিকগঞ্জ সদরে ৪৮ শতাংশ। গবেষণাপত্রটি চলতি বছরের ২৪ জুলাই ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে বাজারের মাছকে বহু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সালমোনেলার সম্ভাব্য বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় ১২ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এতে অ্যাম্পিসিলিনের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। টেট্রাসাইক্লিন ও সিপ্রোফ্লক্সাসিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হার ছিল ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ করে। গবেষকদের হিসাবে, শনাক্ত সালমোনেলার প্রায় ৪৩ শতাংশ একাধিক শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। প্রজাতিভেদে বহু ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর হার রুইয়ে ৫৩ দশমিক ৩, পাঙাশে ৪২ এবং তেলাপিয়ায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। গবেষণায় যুক্ত আবু বকর সিদ্দিকের মতে, রুইয়ে সালমোনেলার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেলেও মাছটি স্বভাবগতভাবেই সংক্রমণের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রমাণ নেই। দূষিত পানি, মাছের পরিবহন ও সংরক্ষণ, বাজারের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং একই সরঞ্জাম দিয়ে বিভিন্ন মাছ প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে জীবাণু ছড়াতে পারে। এসব জীবাণু একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় সংক্রমণ ঘটলে চিকিৎসা জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে গবেষণায় এসব জীবাণু বা তাদের প্রতিরোধী জিন সরাসরি মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর দূষণ শুধু পুকুরে সীমাবদ্ধ নয়। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গোপাল চন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে ২০২১ সালে বঙ্গোপসাগর থেকে ধরা ১০ প্রজাতির ১০০টি মাছ পরীক্ষা করে প্রতিটি প্রজাতিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৭ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ পরীক্ষা করেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি তামা, সীসা ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানা, ট্যানারি, ডাইং ইউনিট, ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও অপরিশোধিত নগর বর্জ্য থেকে ভারী ধাতু জলাশয়ে মিশতে পারে। এসব ধাতু পচে নষ্ট হয় না; পুকুর ও নদীর তলদেশের পলিতে জমে থেকে ক্ষুদ্র প্রাণী ও উদ্ভিদের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল, প্যাকেট ও মাছ ধরার জাল ভেঙে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র কণা বর্জ্যপানির সঙ্গে জলাশয়ে মেশে। মাছের খাবার ও পুকুরের অব্যবস্থাপনাও দূষণের উৎস হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাইদুল আরেফিন বলেন, একটি গবেষণার ভিত্তিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা দূষকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। প্রতিটি বিষাক্ত পদার্থের একটি সহনীয় মাত্রা রয়েছে; তা অতিক্রম করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবেষণার পাশাপাশি কার্যকর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক মো. মাহফুজ আলম প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ, পুকুরের পানি ও মাছের খাবারের মান নিয়মিত পরীক্ষা, চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বাজারে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। মাছ দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান প্রাণিজ আমিষের উৎস। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মাছের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। গবেষণাগুলোর ফল বলছে, ঝুঁকির উৎস শুধু মাছের পুকুরে নয়; উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দূষণের উৎস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।