এক সময় শবে বরাতে মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি বাড়িতে তৈরি করতেন নানা ধরনের হালুয়া ও চালের রুটি। নিজেদের খাওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তা বিতরণ ছিল বহু বছরের ঐতিহ্য। কালের বিবর্তনে এখন ঘরে তৈরি হালুয়া-রুটি বিতরণের রীতি অনেকটাই কমে এসেছে। শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় অনেকে আর এসব খাবার তৈরি করতে পারেন না। তাদের জন্য সহজ সমাধান হয়ে উঠেছে রেডিমেড হালুয়া-রুটি। শবে বরাত উপলক্ষে পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এবং বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে বিশেষ খাবারের আয়োজন দেখা যায়। পুরান ঢাকার বাসিন্দা আশরাফ উদ্দিন লিটন বলেন, “নতুন জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে বড় রুটি ও হালুয়া নিয়ে যান। আবার মেয়ের বাড়ি থেকেও শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো হয়। এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।” চকবাজার, বকশীবাজার, রায়সাহেব বাজার, গেন্ডারিয়া, বংশাল, লালবাগ, নাজিরাবাজার, চানখাঁরপুল ও বাংলাবাজার এলাকায় শবে বরাতের দিন বসে হালুয়া-রুটির বিশেষ বাজার। এসব এলাকায় সুজি, বুট, গাজর, ডিম, বাদাম, পেঁপে ও নারকেল দিয়ে তৈরি হয় নানা স্বাদের হালুয়া। পাশাপাশি মাছ, হাঁস, কুমির, প্রজাপতি, ফুল ও লতাপাতার নকশায় তৈরি হয় রুটি—যা পরিচিত ‘বরাতি’ বা ‘ফেন্সি রুটি’ নামে। রুটির ওজন ১০০ গ্রাম থেকে শুরু করে ১৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। পুরান ঢাকার আবুল হাসনাত সড়কের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ কনফেকশনারির বিক্রেতা বাবু মিয়া বলেন, “দুপুর থেকেই বিক্রি শুরু হয়। বিকেল ও সন্ধ্যায় সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে। গভীর রাত পর্যন্ত বিক্রি চলে। রুটির দাম কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।” বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শামীম জানান, তাদের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে জাফরানি হালুয়া, মস্কোট হালুয়া, গাজরের বরফি, অরেঞ্জ, স্ট্রবেরি, কলা ও আনারসের হালুয়া। এসবের দাম কেজিপ্রতি সাড়ে ৭০০ টাকা। বুটের ডালের হালুয়ার দাম সাড়ে ৫০০ টাকা কেজি। সাধারণ হালুয়ার দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকার মধ্যে। প্রিমিয়াম হালুয়া—যেমন কাঠবাদাম, পেস্তা ও কাজুবাদামের হালুয়ার দাম ১,৪২৫ থেকে ১,৫৯৫ টাকা পর্যন্ত। প্যাকেজ হালুয়া পাওয়া যাচ্ছে ১,০০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায়। ফেন্সি রুটির দাম কেজিপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা হলেও নকশা ও আকারভেদে সর্বোচ্চ দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আনন্দ কনফেকশনারি ছাড়াও সিটি কনফেকশনারি, আলাউদ্দিন সুইটসসহ বিভিন্ন বেকারিতে শবে বরাতের বিশেষ আয়োজন থাকে। হালুয়া-রুটির পাশাপাশি মাছের বড়া, জিলাপি, ঠাণ্ডা দই, মতিচুর লাড্ডু ও রসমালাইও বিক্রি হয় সমানতালে। একসময় এই আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল পুরান ঢাকায়। এখন রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকা এবং চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও এ উপলক্ষে বিশেষ বাজার বসে। আগোরা, মিনা বাজার ও স্বপ্নের মতো সুপারশপেও মিলছে প্যাকেটজাত হালুয়া-রুটি। অনলাইনে অর্ডার দিয়েও ঘরে বসে সংগ্রহ করা যাচ্ছে। শবে বরাতে হালুয়া-রুটি খাওয়া বা বিতরণের কোনো ধর্মীয় বিধান না থাকলেও এটি বহুদিনের সামাজিক রীতি। এর মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি হয় এবং সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হয়। পুরান ঢাকার বাসিন্দা আলী আহমেদ বলেন, “শুধু হালুয়া-রুটিই নয়, এদিন অনেকেই গরু কিনে ভাগাভাগি করেন। সাধ্য অনুযায়ী প্রতিটি ঘরেই ভালো খাবার রান্না হয়। প্রতিবেশীদের মধ্যে খাবার বিতরণ চলে, আর রাতভর মসজিদে মসজিদে তবারক দেওয়া হয়।”