সিলেটে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী, সংসারের একমাত্র অবলম্বন প্রীতম ও বেড়াতে আসা ঠিকাদার সাইফুল রাতভর গানের আসর। দর্শকদের মুগ্ধ করে গান গেয়ে বাবার সঙ্গে ভোরে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছিলেন ১৭ বছরের বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারে বৃহস্পতিবার রাতে গান গেয়েছিলেন তিনি। গান শেষে যখন বাড়ি ফেরার যাত্রা শুরু করেন, তখনও কেউ জানতেন না—এটাই হবে তার জীবনের শেষ পথচলা। শুক্রবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ইউনিক ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান পেহেলীসহ নয়জন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এক রাতের আনন্দের পর সকালেই নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহতদের মধ্যে কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কেউ এসেছিলেন সিলেটে বেড়াতে, কেউ ফিরছিলেন বাড়ির পথে। আর পেহেলী ভৈরবীর মতো একজন তরুণ শিল্পীর স্বপ্নের পথ থেমে গেল মাত্র ১৭ বছর বয়সেই। গানের আসর থেকে শেষ যাত্রা কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার চন্ডিবের গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে পেহেলী ভৈরবী স্থানীয়ভাবে বাউলশিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্বনাথের বৈরাগীবাজার এলাকার হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারে আয়োজিত গানের অনুষ্ঠানে বাবার সঙ্গে এসেছিলেন তিনি। মাজারের শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা সোহল আহমদ বলেন, প্রতি মাসে এক দিন সেখানে দোয়া মাহফিল হয়। দোয়া মাহফিল শেষে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের জন্য গানের আয়োজন করা হয়। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পেহেলী সেখানে গান গাইতে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন বাবা। গানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্বনাথের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, তিনি পেহেলীর বেশ কয়েকটি গানের ভিডিও ধারণ করেছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারও করেছিলেন। এর আগেও ওই মাজারে পেহেলী গান গেয়েছেন বলে জানান তিনি। আবুল হোসেন বলেন, “সকালে শুনি তিনি মারা গেছেন। খুব খারাপ লাগছে শিল্পীর জন্য।” নিজের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুষ্ঠানটির কথা জানিয়েছিলেন পেহেলী। বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বিশ্বনাথের বৈরাগীবাজারে হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা লিখেছিলেন এবং আশপাশের মানুষকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আমন্ত্রণই যে তার জীবনের শেষ গানের আসরের আমন্ত্রণ হয়ে থাকবে, তা কেউ ভাবেননি। এক দুর্ঘটনায় নয়জন শুক্রবার সকালে সিলেট থেকে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল ইউনিক পরিবহনের একটি বাস। বিপরীত দিক থেকে আসছিল বেঙ্গল পরিবহনের আরেকটি বাস। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় বাস দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলেই এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন—কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের সাইফুল ইসলাম (৫০), দক্ষিণ সুরমার চন্ডীপুরের তিন বছর বয়সী ফাইজা, সিলেট নগরীর সোবহানীঘাটের সপ্তম রায় প্রীতম (২২), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আবুল হোসেন (৪৪), সিলেটের জৈন্তাপুরের আরমান (১৯), কুমিল্লার সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাইফুল ইসলাম ইমন এবং কিশোরগঞ্জের নিকলীর রুবেল সূত্রধর (৩৭)। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী। শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, নিহত নয়জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি। বেড়াতে এসে আর বাড়ি ফেরা হলো না সাইফুলের নিহত সাইফুল ইসলাম কুলিয়ারচরের বাসিন্দা ও পেশায় ঠিকাদার ছিলেন। পাঁচ বন্ধু মিলে সিলেট ভ্রমণে এসেছিলেন তারা। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতসহ কয়েকটি স্থান ঘুরে শুক্রবার বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। সাইফুলের সঙ্গে থাকা ফারুক মিয়া ও আব্দুল লতিফ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। ফারুক মিয়া বলেন, পাঁচ বন্ধু সিলেটে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন উড়োজাহাজে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। আর তিনি, সাইফুল ও লতিফ ইউনিক পরিবহনের বাসে করে ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার সময় তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে নিজেকে আহত অবস্থায় দেখতে পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ফারুক বলেন, “এ দুর্ঘটনায় আমার বন্ধু সাইফুল ইসলাম নিহত হয়েছেন। সাইফুল পেশায় একজন ঠিকাদার ছিলেন।” নিহতের পরিবার জানিয়েছে, সাইফুল এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা ছিলেন। তিনি কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতিও ছিলেন। সিলেট ভ্রমণ শেষে পরিবারের কাছে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই ফেরাই হয়ে গেল শেষ ফেরা। সংসারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন প্রীতম নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক গল্পগুলোর একটি সপ্তম রায় প্রীতমের। মাত্র ২২ বছর বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন তিনি। বহুদিন আগে পানিতে ডুবে মারা যায় তার একমাত্র ভাই। এরপর অল্প বয়সেই পরিবারের হাল ধরতে হয় প্রীতমকে। নিজের উপার্জন দিয়ে বৃদ্ধ মা ও বোনের দেখাশোনা করতেন তিনি। শুক্রবার ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন প্রীতম। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ যাত্রা। প্রীতমের মাসতুতো বোনের জামাই কাজল ভৌমিক বলেন, প্রীতমই ছিলেন পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। তার উপার্জনের ওপরই নির্ভর করত বৃদ্ধ মা ও বোনের সংসার। প্রতিবেশী নরেন ভট্টাচার্য বলেন, ছোটবেলা থেকেই প্রীতমকে তারা কাছ থেকে দেখেছেন। নিহতের তালিকায় তার নাম দেখে তিনি ভেঙে পড়েছেন। প্রীতমের মৃত্যু শুধু একজন তরুণের মৃত্যু নয়; তার সঙ্গে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল একটি পুরো পরিবার। শিল্পী মহলে শোক পেহেলী ভৈরবীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন সহশিল্পী ও পরিচিতজনেরা। শিল্পী মুন লিখেছেন, জীবন কতটা অনিশ্চিত, পেহেলীর মৃত্যু যেন তারই নির্মম উদাহরণ। রাতের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে সকালে বাড়ি ফেরার পথেই সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে—এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শিল্পী এসকে সুমনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেহেলীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তার জন্য সবার আশীর্বাদ কামনা করেন। পেহেলীর পরিচিতজনদের ভাষ্য, অল্প বয়সেই গানকে পেশা হিসেবে নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছুটে বেড়াতেন তিনি। দূর-দূরান্তে গিয়ে গান করতেন। সিলেটের এই অনুষ্ঠানও ছিল তার সেই পথচলারই অংশ। যে সড়ক আবারও কেড়ে নিল প্রাণ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সিলেট থেকে ঢাকাগামী বাসের যাত্রী আব্দুল লতিফ জানান, ইউনিক পরিবহনের বাসটি শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে সিলেট থেকে রওনা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় বিপরীতমুখী বেঙ্গল পরিবহনের বাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। উপজেলা বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক জমরুত মিয়া বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সংঘর্ষে বাসের এক পাশের যাত্রীরাই বেশি হতাহত হয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ কী—তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। এক সকালে বদলে গেল নয় পরিবারের জীবন একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু কয়েকজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় না; এর অভিঘাত পৌঁছে যায় বহু পরিবারের জীবনে। শুক্রবারের দুর্ঘটনাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পেহেলীর পরিবার হারিয়েছে তাদের সম্ভাবনাময় এক তরুণ শিল্পীকে। প্রীতমের পরিবার হারিয়েছে একমাত্র অবলম্বনকে। সাইফুলের পরিবার হারিয়েছে একজন স্বামী, বাবা ও উপার্জনক্ষম সদস্যকে। অন্য নিহতদের পরিবারেও একইভাবে নেমে এসেছে অপূরণীয় শোক। এক রাত আগে যে মঞ্চে গান, আনন্দ আর দর্শকদের হাততালিতে মুখর ছিল পরিবেশ, পরদিন সকালেই সেই আনন্দের স্মৃতি বদলে গেছে কান্নায়। পেহেলী ভৈরবীর ফেসবুকের শেষ আমন্ত্রণ এখন কেবল একটি পুরোনো পোস্ট। যে শিল্পী লিখেছিলেন, আশপাশের মানুষকে গানের অনুষ্ঠানে আসার জন্য—সেই শিল্পীই আর ফিরলেন না নিজের বাড়িতে। সিলেটের মহাসড়কে একটি বাস দুর্ঘটনা তাই শুধু নয়জন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি একসঙ্গে থামিয়ে দিয়েছে নয়টি পরিবারের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যতের অনেক হিসাব। আর প্রশ্ন রেখে গেছে—সড়কে নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা কবে মিলবে?