কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ে একসময় ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ বন। এখন সেই ভূদৃশ্যের বড় অংশজুড়ে শরণার্থী শিবির, ঘনবসতি ও মানবিক সহায়তার অবকাঠামো। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের প্রায় নয় বছর পরও তাঁদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হয়নি। দীর্ঘায়িত এই সংকট বাংলাদেশের জন্য একযোগে মানবিক, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক কারবার, অস্ত্রের বিস্তার, অপহরণ, মানবপাচার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়মিত সামনে আসছে। অন্যদিকে বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট, স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা এবং জনসেবার ওপর চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। তবে এই সংকটের দায় পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধী চক্রের পাশাপাশি ক্যাম্পের সাধারণ বাসিন্দারাও সহিংসতা, ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তার শিকার। ফলে সমস্যাটিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মিয়ানমারের সংঘাত, প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা, সীমান্তের দুর্বলতা, জীবিকার সীমিত সুযোগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ। ১২ লাখের বেশি মানুষের আশ্রয়, সহায়তার প্রয়োজন ১৬ লাখের জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ লাখ। তাঁদের অধিকাংশই কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন; একটি অংশ রয়েছেন ভাসানচরে। জাতিসংঘের [২০২৬ সালের যৌথ মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাঁদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জরুরি চাহিদা পূরণে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এ পরিকল্পনার লক্ষ্য প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সহায়তা করা। এর মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ছাড়াও উখিয়া-টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে। খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশন, সুরক্ষা এবং জীবিকাসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলোর এই আবেদনকে অবশ্য ইতিমধ্যে পাওয়া অর্থ বা বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট থেকে ব্যয় হওয়া অর্থের হিসাব হিসেবে দেখা যাবে না। রোহিঙ্গা সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও তাই একমাত্র মানবিক সহায়তার অঙ্ক দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। ক্যাম্প পরিচালনা, নিরাপত্তা, প্রশাসন, সড়ক ও অবকাঠামো, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় জনসেবার ওপর বাড়তি চাপের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে অর্থপ্রবাহ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। পাহাড়ের ক্ষতি শুধু গাছ হারানোর হিসাব নয় রোহিঙ্গা বসতি সম্প্রসারণের ফলে কক্সবাজারের বনাঞ্চল, পাহাড় ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে। আশ্রয়স্থল নির্মাণ, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব এই চাপের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত *ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট* সাময়িকীর একটি গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণায় ওই সময়ে বন ও উদ্ভিদ আচ্ছাদিত জমি ৬ দশমিক ২০ শতাংশ এবং কৃষিজমি ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ কমার চিত্র উঠে এসেছে। একই সময়ে বসতিপূর্ণ ও নির্মিত এলাকার পরিমাণ বেড়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে, যখন বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। আরেকটি ২০২৬ সালের গবেষণায় টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকার ২০১৩–২০২৫ সালের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে গবেষণাধীন এলাকার নির্মিত ভূমির অংশ ২০১৩ সালের ৬ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১ শতাংশে পৌঁছানোর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা ক্যাম্পের ভেতরে উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমে যাওয়া এবং ভূমির তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাও বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণাগুলোর ফলাফল থেকে বোঝা যায়, সংকটের পরিবেশগত প্রভাব কেবল গাছ কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভূমির স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তন, পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়া, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সমস্যা—সব মিলিয়ে দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তবে গবেষণার নির্দিষ্ট এলাকা ও সময়সীমার ফলাফলকে পুরো কক্সবাজারের বনভূমির ক্ষতির পরিমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত নয় বছরে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১২ হাজার একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত বা উজাড় হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজার একর পাহাড়ি বন শিবির নির্মাণে এবং বাকি অংশ জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও অবকাঠামোর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর এই হিসাবের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি ও এলাকাভিত্তিক বিভাজন প্রকাশ্য নথিতে যাচাই করা জরুরি। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) কক্সবাজারের সদস্যসচিব এইচএম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে পরিবেশগত সংকট হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, ক্যাম্প সম্প্রসারণ, পাহাড় কাটা, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয়দের অবৈধ পাহাড় কাটা, বন দখল ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষায় শুধু ক্যাম্পের ভেতরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না; বনভূমি দখল, অবৈধ পাহাড় কাটা ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট ক্ষতির বিরুদ্ধেও সমানভাবে আইন প্রয়োগ জরুরি। প্রতিদিন ১৪০ টনের বেশি বর্জ্য, বর্ষায় বাড়ে ঝুঁকি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (এনআরসি) ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ১৪০ টনের বেশি কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। প্রায় অর্ধেক পরিবার নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থানে বর্জ্য পৌঁছাতে পারে; ফলে কিছু বর্জ্য পথঘাটে ছড়িয়ে পড়ে এবং নালা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনেও ক্যাম্পের ৩৩টি স্থানে প্রতিদিন প্রায় ১২০ টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে কিছু পার্থক্য থাকলেও বর্জ্যের পরিমাণ যে বিপুল, তা স্পষ্ট। বর্ষাকালে বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতা জলাবদ্ধতা, দূষণ এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্ট তৈরি, নিরাপদ নিষ্কাশন এবং বাসিন্দাদের অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা জরুরি। শুধু শিবিরের পরিচ্ছন্নতা নয়, আশপাশের স্থানীয় জনপদ ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে। মাদকের রুটে সীমান্ত, ক্যাম্পকে ব্যবহার করছে অপরাধী চক্র কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক প্রবেশের ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভৌগোলিক অবস্থান ও জনঘনত্বকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রের একটি অংশ মাদক পরিবহন ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও অভিযোগে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে উখিয়ার একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৪৩ হাজার ৬০০ ইয়াবা, একটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ২৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। জুলাইয়ে উখিয়ার পানবাজার এলাকায় ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অভিযানে এক রোহিঙ্গা যুবকের কাছ থেকে ছয় হাজার ইয়াবা উদ্ধারের তথ্যও দেওয়া হয়েছে। ৮ এপিবিএনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১৪ মাসে বিভিন্ন মামলার প্রায় ১৬৬ আসামিকে গ্রেপ্তার এবং দুই লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে অপহৃত ১৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধারের কথাও জানানো হয়েছে। সীমান্তে মাদক প্রবেশের সাম্প্রতিক ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে। ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও বাইশফাঁড়ি সীমান্ত এলাকায় পৃথক অভিযানে বিজিবি দুই লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে। এর মধ্যে একটি অভিযানে ক্যাম্প-৮-এর দুই রোহিঙ্গা যুবককে ১০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। অন্য অভিযানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার হয়; ওই চালানের মালিক শনাক্ত হয়নি। এসব তথ্য মাদক চোরাচালানের ব্যাপ্তি এবং সীমান্ত নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের পরিচয় দিয়ে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রমাণ করা যায় না। মাদকের সরবরাহব্যবস্থায় সীমান্তপারের কারবারি, পরিবহনকারী, স্থানীয় সহযোগী ও অর্থায়নকারীদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে আলাদা করে চিহ্নিত করা জরুরি। ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গারা আসার আগে থেকেই বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশ করত। তবে তাঁদের আগমনের পর ইয়াবা আসার পরিমাণ বেড়েছে—এ কথা তিনি স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি, চেকপোস্ট, বিশেষ অভিযান এবং বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মাদক, অস্ত্র, অপহরণ ও সশস্ত্র অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমানের মতে, সীমান্ত অপরাধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়; সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনও প্রয়োজন। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, জব্দ ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের উৎস, সীমান্তপারের যোগাযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীদের ভয়ে সাধারণ রোহিঙ্গারাও ক্যাম্পের ভেতরের পরিস্থিতি বোঝার জন্য সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা কমিউনিটি লিডার রফিক উদ্দিন বলেন, তাঁরা নিরাপদে থাকতে চান। তাঁর ভাষ্য, মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা রোহিঙ্গা হলেও তাঁদের কাজের ক্ষতি পুরো জনগোষ্ঠীকে বহন করতে হচ্ছে। সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক কারবারি ও অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ বাসিন্দাদের ভয়ভীতি থেকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। অপরাধের তথ্য জানালে নিরাপত্তা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং অভিযোগ জানানোর নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকলে ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধী চক্রের প্রভাব কমানো কঠিন হতে পারে। এখানে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্যও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে অভিযান পরিচালনা, অপরাধী শনাক্ত করা, অস্ত্র ও মাদকের উৎস খুঁজে বের করা এবং নিরপরাধ বাসিন্দাদের ক্ষতি এড়ানো—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হয়। তাই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান এবং স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে আস্থাভিত্তিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় অর্থনীতিতে চাপ, আবার নতুন বাজারও উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রোহিঙ্গা আগমনের পর জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে। জমি ও বাড়িভাড়ার বাজার, শ্রমের চাহিদা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবায় এর প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাশেমের ভাষ্য, কয়েক বছরে শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ইয়াবা, অস্ত্র ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধও তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, দ্রুত প্রত্যাবাসনই এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য জরুরি। তবে স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র একমুখী নয়। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের কারণে খাদ্য, পরিবহন, নির্মাণ, দোকানপাট ও সেবা খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বেড়েছে। কিছু ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী মানুষ এর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। আবার সহায়তার বড় অংশ ক্যাম্পকেন্দ্রিক হওয়ায় আশপাশের দরিদ্র স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে বঞ্চিত হওয়ার অনুভূতিও তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের *চিটাগং ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস*-এ ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন ও কাছাকাছি এলাকার ১১৫ জনের জরিপ, ১৫টি বিস্তারিত সাক্ষাৎকার এবং একজন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় স্থানীয়দের মধ্যে শ্রমের চাহিদা ও আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য-পানি-জ্বালানি সংগ্রহ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবার ওপর চাপের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। কিছু মানুষ ক্যাম্পকেন্দ্রিক ব্যবসা ও কর্মসংস্থান থেকে উপকৃত হলেও সামগ্রিকভাবে অনেক স্থানীয় পরিবার নেতিবাচক প্রভাবের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, *ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট*-এ প্রকাশের জন্য উপস্থাপিত একটি গবেষণায় উপগ্রহচিত্র ও পারিবারিক জরিপের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছে, শরণার্থী ক্যাম্পের কাছাকাছি এলাকায় মানবিক সহায়তা ও এনজিও কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বেশি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ক্যাম্পের অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু লাভ বা ক্ষতির একক হিসাবে ব্যাখ্যা করা যায় না; এর সুফল ও চাপ বিভিন্ন পরিবার ও পেশার মধ্যে অসমভাবে বণ্টিত হচ্ছে। এ অবস্থায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সড়ক, পানি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের জন্য একই সঙ্গে উন্নয়নমূলক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিযোগিতা ও বঞ্চনার অনুভূতি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রত্যাবাসনের তালিকা এগোলেও ফেরার নিশ্চয়তা নেই সংকটের মূল সমাধান রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা সেই পথকে জটিল করে রেখেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের দেওয়া তালিকা থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশের তালিকায় তখন ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের নাম ছিল। তবে মিয়ানমার বলেছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না। তালিকা যাচাইয়ের এই অগ্রগতি তাই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত হওয়ার সমান নয়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু পরিচয় যাচাই যথেষ্ট নয়। তাঁদের নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, জীবিকা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হওয়ার বাস্তব ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যথায় প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না এবং আবারও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সমাধানে প্রয়োজন একাধিক পথের সমন্বয় রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু শরণার্থী ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, বন ও জীববৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা। ফলে সমাধানের জন্য একযোগে কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। প্রথমত, মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক ভাঙতে সীমান্ত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অর্থের উৎস শনাক্তকরণ এবং অপরাধী চক্রের স্থানীয় ও আন্তসীমান্ত যোগাযোগের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পে সাধারণ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ ও অপরাধের সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, পাহাড়, বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। চতুর্থত, আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জনসেবা ও জীবিকার ওপর চাপ কমাতে উন্নয়ন সহায়তা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ ও মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা অব্যাহত রাখা। মানবিক সহায়তা জরুরি জীবন রক্ষার ব্যবস্থা; কিন্তু এটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। কক্সবাজারের পাহাড়, বন ও জনপদের ওপর দীর্ঘদিনের চাপ কমাতে হলে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবেশ পুনরুদ্ধার, স্থানীয় উন্নয়ন এবং প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের একটি অংশের অপরাধকে পুরো জনগোষ্ঠীর পরিচয় হিসেবে দেখলে যেমন সমস্যার সমাধান হবে না, তেমনি নিরাপত্তা ও পরিবেশের বাস্তব উদ্বেগ উপেক্ষা করেও সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—মানবিক দায়িত্ব পালন, নিজের জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের সুরক্ষা এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যকে একই নীতির মধ্যে এগিয়ে নেওয়া।