চীন হয়ে ঢাকায় পরাগ জৈন, বললেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান; ব্রিকস ও দ্বিপক্ষীয় সফরে তারেক রহমানকে ভারতের আমন্ত্রণের কথাও জানাল সরকার ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর ঘিরে যখন কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে, তখন সেই জল্পনাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, চীন সফর শেষে পরাগ জৈনের ঢাকায় আসাকে অস্বাভাবিকভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। সফর শেষে সরকার চাইলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিও দিতে পারে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “‘র’ প্রধান চীন থেকে ঢাকা এসেছেন। এটা তার এক ধরনের সফর। এটি নিয়ে জল্পনার কিছু নেই।” তবে একই দিনে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফর এবং আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে ‘র’ প্রধানের ঢাকা সফর এবং দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ—দুটি ঘটনা একই সময়ে সামনে আসায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গতিপথ নিয়ে কৌতূহল আরও বেড়েছে। ‘র’ প্রধানের সফর নিয়ে আপাতত নীরব ঢাকা-নয়াদিল্লি পরাগ জৈনের সফর নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, চার সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছেন। চীন সফর শেষে তার এই সফরকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও সরকার এটিকে নিয়মিত যোগাযোগের অংশ হিসেবেই দেখাতে চাইছে। জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট—সফরটিকে ঘিরে সরকারের পক্ষ থেকে এখনই কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার অবস্থান নেই। হাসিনাকে নিয়ে ভারতের প্রতি কঠোর বার্তা ‘র’ প্রধানের সফর নিয়ে জল্পনা নেই বললেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি সামনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। ভারতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতের কাছে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তার ভাষায়, “আমরা একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফেরত চাই, দেশে আইনের আওতায় আনতে চাই। সেটা তো হচ্ছেই না, এবার রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এ ব্যাপারগুলোকে ভারতকে আন্তরিকভাবে নিতে হবে।” জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যে আরও স্পষ্ট হয়, শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির অবস্থানকে ঢাকা এখন দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করছে। তিনি বলেন, দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা চললেও সেই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারতের দিক থেকেও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্রিকসে আমন্ত্রণ, দ্বিপক্ষীয় সফরও সামনে এর মধ্যেই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের ‘আউটরিচ সেশন’-এ অংশ নেওয়ার জন্যও তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। তবে জাহেদ উর রহমান পরিষ্কার করেছেন, ব্রিকসের আমন্ত্রণটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালও জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ একদিকে দিল্লির সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ, অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কঠোর অবস্থান—দুই বিপরীত বার্তাই এখন একই সঙ্গে দৃশ্যমান। ‘মানসম্মত শিক্ষা’ ও এসএসসির ফল প্রেস ব্রিফিংয়ে জাহেদ উর রহমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে যেনতেনভাবে নম্বর দেওয়া ও পাস করানোর প্রবণতা ছিল। বর্তমান সরকার শিক্ষার মানের দিকে গুরুত্ব দেবে—এটি শুরুতেই জানানো হয়েছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এবার ফলাফলে কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়ানোর বদলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ফলাফল প্রতিফলিত হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তায় বেসরকারি খাত দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরির উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকটকালীন সময়ে বেসরকারি অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকেও কাজে লাগানো যাবে। ১৮০ দিন পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ? সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন বলেও জানিয়েছেন জাহেদ উর রহমান। তবে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। একই সঙ্গে ১৮০ দিন পূর্তির পর মন্ত্রিসভায় রদবদল হতে পারে—এমন কোনো ইঙ্গিত সরকার দেয়নি বলেও জানান তিনি। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের কাজের মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নিতে পারেন। সাকিব প্রসঙ্গেও বিতর্কিত মন্তব্য প্রেস ব্রিফিংয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। সাকিবকে নিয়ে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। সাবেক সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে তিনি বলেন, সাকিব আল হাসান ভালো খেলোয়াড় হতে পারেন, যে শেখ হাসিনার সঙ্গে এলাইনড হয় এবং এখনও আছে সে নষ্ট পচে যাওয়া মানুষ। তিনি এসব ফালতু কথা বলেন সরকারকে কিছুটা চাপে ফেলার জন্য। শুধু সাকিব আল হাসান নয় শেখ হাসিনাও বাংলাদেশে আসলে পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে আসবেন, পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাবেন, পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন বিচারিক প্রক্রিয়ায়। এরপর আদালত যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটা সবাই মেনে নেবো। এটি ফ্যাসিস্ট আমল নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। নিশ্চিতভাবে সবচেয়ে বীভৎস অপরাধীও সেটি সাকিব আল হাসান কিংবা হাসিনা যেই হোক যা যা নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার সেগুলো পাবেন। সব মিলিয়ে ‘র’ প্রধানের ঢাকা সফর নিয়ে সরকার আপাতত জল্পনা এড়াতে চাইছে। কিন্তু একই সময়ে দিল্লির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ, আর ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কঠোর বার্তা—দুই দেশের সম্পর্ক যে নতুন এক কূটনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট।