হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) হুমকি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার প্রধান শফিকুল ইসলাম এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গ্রেপ্তারের পর তাকে বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা মামলায় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে শুক্রবার ভোররাতে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব। মামলায় সরকারি কাজে বাধা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার প্রতিবেদন আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার এজাহার অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে ৩৪ জন জামায়াত নেতা-কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা শাহজালাল বিমানবন্দরে আসেন। ওই সময় বিমানবন্দরে যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ট্রলি সংগ্রহের ক্ষেত্রে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। পাশাপাশি লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে বিলম্ব হওয়ায় কয়েকজনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এজাহারে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলতে বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে নেওয়া হয়। তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় আখতারুজ্জামান তাঁর দিকে এগিয়ে যান এবং গালিগালাজ ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার বিবরণে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে নির্বাহী পরিচালককে ‘পিটিয়ে’ এবং ‘ঘাড় ধরে’ বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও তাকে বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে দেখা গেছে। ভিডিওতে নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে ‘ঘাড় ধরে বের করে দেব’ এবং ‘মাইর খাইতে চান?’—এ ধরনের বক্তব্য দিতে শোনা যায়। এজাহারে আরও বলা হয়, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন। এরপর আখতারুজ্জামান উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে আরও হুমকিমূলক বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার একপর্যায়ে বিমানবন্দরের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় কয়েকজন প্রটোকল সহকারী ভিডিও ধারণ করছিলেন। দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন সেখানে ভিডিও ধারণ না করতে নিষেধ করলে আখতারুজ্জামান তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ নেই বলে মামলায় দাবি করা হলেও প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর বক্তব্যের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণ করা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক প্রতিনিধির সঙ্গেও আখতারুজ্জামান মারমুখী আচরণ করেন এবং সাধারণ যাত্রীদের জন্য রাখা জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলার অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গ্রেপ্তারের আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় আখতারুজ্জামান বলেন, ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি নিজের জন্য দোয়া চেয়ে বলেন, জনগণ ও বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য কাজ করতে গিয়ে শহীদ হলে যেন আল্লাহ তাঁর সেই দাবি কবুল করেন। তিনি জনগণের অধিকারের সংগ্রামে থাকার কথাও বলেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় ডিবির কর্মকর্তারা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসায় গিয়ে তাকে হেফাজতে নেন। পরে তাকে বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আখতারুজ্জামান কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে কটিয়াদী আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হন। বিমানবন্দরের ঘটনার বিষয়ে আখতারুজ্জামানের বক্তব্যের পাশাপাশি মামলার তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মামলার এজাহার ও পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে রয়েছে; আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে এগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।