প্রকাশ :: ... | ... | ...

শিক্ষকদের জন্য আসছে নতুন আচরণবিধি, রাজনীতিতে সম্পৃক্ততায় কড়াকড়ি


সংযুক্ত ছবি

দলীয় রাজনীতি ও শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সীমারেখা নির্ধারণের উদ্যোগ; পাঠদানে বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই আচরণবিধি তৈরি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের নির্দেশনার পর সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধির খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। খসড়া পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর তা চূড়ান্ত করা হবে। নতুন বিধিতে শিক্ষকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কর্মকাণ্ড, দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা এবং শিক্ষার বাইরে অন্য পেশা বা কাজে যুক্ত থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো খসড়াটি চূড়ান্ত হয়নি। ফলে কোন কর্মকাণ্ড সরাসরি নিষিদ্ধ হবে, কোন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে কিংবা কোনো বিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হবে—এসব বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানাননি। সম্প্রতি শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানো, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি পর্যালোচনা সভা হয়। সভায় মাধ্যমিক শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কোচিংনির্ভরতা, স্মার্টফোনে আসক্তি ও আনন্দময় শিক্ষার ঘাটতির পাশাপাশি শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা ও শ্রেণিকক্ষের পাঠদান তদারকির বিষয়ও উঠে আসে। আলোচনা ও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্রস্তাবের পর শিক্ষার মানোন্নয়নে ১৫ দফা অনুশাসন দেওয়া হয়। পরে ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সভার ‘রেকর্ড অব নোটস’ ও কার্যবিবরণী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)সহ শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসনের অন্যতম বিষয় শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং শিক্ষকদের শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা। এর অংশ হিসেবেই শিক্ষকদের আচরণবিধি সংশোধন বা নতুন করে প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতি কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও এসেছে। নতুন আচরণবিধিতে এসব ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাব শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলেও পড়তে পারে। এ কারণে শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে মনোযোগী করা এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে আচরণবিধিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি বলেন, দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা, রাজনৈতিক পদ-পদবি ধারণ, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কিংবা শিক্ষকতার প্রভাব ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো বিষয়গুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, তা খসড়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত বিধান কী হবে, তা খসড়া অনুমোদনের পরই জানা যাবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও আচরণবিধি প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হলে তার পেশাগত অবস্থান কীভাবে নির্ধারিত হবে, সে প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে। রাজনৈতিক পদ গ্রহণ, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া কিংবা সক্রিয় রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে, তা চূড়ান্ত আচরণবিধিতে স্পষ্ট হতে পারে। রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকতার বাইরে অন্য পেশা বা কর্মকাণ্ডের বিষয়েও বিধিনিষেধ আনার উদ্যোগ রয়েছে। এমন ব্যবসা, পেশা বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা, যা নিয়মিত পাঠদান ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, সেগুলোও নতুন বিধির আওতায় আসতে পারে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে, শিক্ষক যেন নির্ধারিত কর্মসময় ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। শিক্ষকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেও বাড়ানো হচ্ছে নজরদারি। দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাউশির কর্মপরিকল্পনায় প্রধান শিক্ষকদের তথ্য হালনাগাদ, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পর্যবেক্ষণের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর কথা রয়েছে। মাউশির সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’-এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ভিডিও কলে মনিটর করবেন বলেও কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ। গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি এসব বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডসহ সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর নির্দেশনাও রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। একটি প্রজন্মকে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আচরণবিধির উদ্দেশ্য কোনো শিক্ষককে অযথা নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং শিক্ষকতার মর্যাদা সমুন্নত করা এবং পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহির একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা। শিক্ষকরা যেন শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান করেন এবং শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে মনোযোগী থাকেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। মাউশির মহাপরিচালক আরও বলেন, দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে আস্থা, সম্মান ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আচরণবিধির পাশাপাশি শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও পাঠদানের মানোন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভালো কাজের জন্য শিক্ষকদের উৎসাহ ও স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগে একদিকে পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে শিক্ষকদের সক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। শিক্ষকদের নিরুৎসাহিত করা নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করাই লক্ষ্য, যেখানে তাঁরা আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিতে পারেন।