প্রকাশ :: ... | ... | ...

শিবির নিয়ন্ত্রিত ডাকসু ‘পাকিস্তান প্রেম’ জাহির করছে: ছাত্রদল


সংযুক্ত ছবি

ছবি : বিডিনিউজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটি বলেছে, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সোমবার ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়। সংস্কার শেষে রোববার ডাকসুর সংগ্রহশালা পুনরায় চালু করা হয়। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের ছবি ও তথ্য স্থান পেয়েছে। সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি বা ছবি-সংবলিত উপকরণ দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের সময়কালের কোনো একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি সেখানে নেই বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রদল। ছাত্রদলের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন। এর প্রতিবাদে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হন। ছাত্রদলের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক ধারার বিকাশ ঘটে, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে। সংগঠনটি বলছে, যে ডাকসু বাংলার অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, সেই ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননা। সংগ্রহশালায় জিন্নাহর আরও দুটি ছবি রয়েছে। এর একটি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলীয় ছবি। অন্যটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডনের একটি প্রতিবেদন, যেখানে জিন্নাহর ছবি রয়েছে। ছাত্রদলের অভিযোগ, সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাগুলো উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পর্বের তুলনায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহকে দৃশ্যমানভাবে উপস্থাপন করা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদল। সংগঠনটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, ন্যায্য অধিকার আদায় এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান ডাকসু নেতৃত্ব ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’ হয়েছে। ছাত্রদলের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের স্বার্থের পরিবর্তে ডাকসুকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের অভিযোগ এবং ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি তুলে ধরে সংগঠনটি। বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদল আরও দাবি করে, এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ‘শিবির নিয়ন্ত্রিত’ ডাকসু ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি ‘প্রচ্ছন্ন অনুরাগ’ এবং ‘পাকিস্তান প্রেম’ প্রকাশ করছে। তবে সংগ্রহশালায় কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি বা সংশ্লিষ্ট ঘটনার ছবি প্রদর্শনের অর্থ ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক আদর্শকে সমর্থন করা কি না—এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। সংগ্রহশালার সংস্কারের সঙ্গে যুক্তদের পক্ষ থেকে এর আগে বলা হয়েছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের ঘটনা ও ব্যক্তিত্বকে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তির ছবি থাকা মানেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঐতিহাসিক প্রদর্শনীর প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এক যৌথ বিবৃতিতে ডাকসুর সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি সরানোর দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, বাংলা ভাষার বিরোধিতাকারী জিন্নাহর ছবি অবিলম্বে সংগ্রহশালা থেকে অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শচর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করারও দাবি জানান তাঁরা। ছাত্রদলের দুই নেতা বলেন, ১৯৪৮ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের একইভাবে সোচ্চার হতে হবে। তাঁরা আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনসহ সব ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্মারক ও চেতনার বিকৃতি ঠেকাতে তাঁরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। এদিকে ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কারকে ঘিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংগ্রহশালায় কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও ঘটনা কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়ে সামনে আরও আলোচনা হতে পারে।