সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে তাঁকে ‘আত্মীয়’ হিসেবে উল্লেখ করায় এক সাংবাদিককে আরও ‘পেশাদার’ভাবে প্রশ্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেছেন, তিনি মন্ত্রণালয়ে বসেছেন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, শেখ হাসিনার আত্মীয় হিসেবে নয়। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কাজের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনা ঘটে। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা ও প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনার বিষয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে এক সাংবাদিক বলেন, “পলাতক শেখ হাসিনাকে ফেরত পেতে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শরীফ ওসমান হাদির খুনিদেরও ফেরত দেওয়ার জন্য বলেছে। কোনো আপডেট আছে কি না? কবে নাগাদ ফেরত পাচ্ছেন আপনার আত্মীয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে?” জবাবে আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, “আমি আগেও বলেছিলাম, আপনার প্রশ্নটা আরও প্রফেশনাল হবে। আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে। তার আত্মীয় হিসেবে নয়। আশা করি আপনি আগামীতে প্রফেশনাল ওয়েতে প্রশ্ন করবেন।” এ সময় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকের উদ্দেশে বলেন, “আপনি তো উনার বহুবছরের একটা... উনি কার সাথে ছিলেন, কী করেছেন, খুবই ক্লিয়ারলি এক্সপোজড। ইজন্ট ইট?” শেখ হাসিনার সঙ্গে পার্থর পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মা রেবা রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাতিজি এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বোন। পার্থ বিয়ে করেছেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের বড় মেয়ে শেখ সায়রা রহমানকে। সে হিসেবে পারিবারিক সম্পর্কে শেখ হাসিনা পার্থর ফুফু হন। আন্দালিভ রহমান পার্থর বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জু ছিলেন এইচ এম এরশাদের সরকারের মন্ত্রী। জাতীয় পার্টি বিভক্ত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামে একটি দলের নেতৃত্ব দেন। ২০০৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে আসেন পার্থ। তবে নিজের বর্তমান সরকারি দায়িত্বের প্রসঙ্গে পার্থ স্পষ্ট করেন, তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর মন্ত্রীর দায়িত্বই প্রাসঙ্গিক। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সাংবাদিকের মূল প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাবেক সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে আছেন। তাঁকে ফেরত আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যে অবস্থান নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম *দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস*-এর একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। পার্থ বলেন, তাঁর জানা মতে, বিষয়টি এখন আদালতের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ধারণা, শেখ হাসিনা ভারতে যে পরিস্থিতিতে গিয়েছিলেন, সেটি এক ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হলেও ভারত সরকার এখন রাজনৈতিকভাবে সেই দায় নিতে চাইছে না এবং বিষয়টি বিচার বিভাগের ওপর ছেড়ে দিতে চাইছে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের তো দাবি একটাই; সেটা হলো, শুধু উনি কেন, প্রত্যেককেই আমরা ফেরত চাই। যাদের নামে মামলা, যাদের নামে সব কিছু। বাংলাদেশের জায়গা থেকে আমরা চাই, এই জুলাই আন্দোলন থেকে শুরু করে এর আগেও যে ঘটনাগুলো, সেগুলোর সঠিক বিচার হোক।” অর্থাৎ শেখ হাসিনার পাশাপাশি যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাঁদেরও দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনার পক্ষে সরকারের অবস্থানের কথা জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। জবাবে পার্থ বলেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করা মূলত মানসিকতার বিষয়, শুধু কোনো ব্যবস্থার অংশ নয়। তাঁর অভিযোগ, গত ১৭ বছরে সমালোচনা গ্রহণ করার মতো মানসিকতা দেখা যায়নি। তিনি বলেন, “সমালোচনা শোনার মানসিকতা ছিল না এবং সে কারণেই হয়ত মনে করিয়ে দেওয়া হত, ‘টিভি চ্যানেল আমরা দিয়েছি, আমাদের পক্ষেই কথা বলতে হবে।’” বর্তমান সরকারের সময়ে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এ ধরনের নির্দেশনা বা মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়নি বলেও দাবি করেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত ছয় মাসে তাঁর মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে নির্দিষ্টভাবে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন মন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি পার্থর ‘তথ্যমন্ত্রী হিসেবে’ দায়িত্ব পালনের মন্তব্যটি সংবাদ সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।