প্রকাশ :: ... | ... | ...

সালমান শাহ–শাবনূর: তিন দশকেও কাটেনি সম্পর্কের রহস্য


সংযুক্ত ছবি

নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন সালমান শাহ ও শাবনূর। পর্দায় তাঁদের রসায়ন দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। সেই জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও তখন থেকেই নানা আলোচনা ও গুঞ্জন ছিল। প্রেম, ঘনিষ্ঠতা এমনকি গোপনে বিয়ের দাবিও উঠেছিল। সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর মেলেনি। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহর। পরের বছর জহিরুল হকের ‘তুমি আমার’ ছবিতে প্রথমবার শাবনূরের সঙ্গে জুটি বাঁধেন তিনি। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হওয়ার পর এই জুটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। এরপর ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘আনন্দ অশ্রু’সহ একাধিক ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন তাঁরা। তাঁদের অভিনীত ছবির সংখ্যা ১৪টি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সালমান শাহ তখন বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী সামিরা হক। এর মধ্যেই শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গনে গুঞ্জন ছড়াতে থাকে। সে সময়ের বিনোদন পত্রিকাগুলোতেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এমনকি সালমান ও শাবনূর গোপনে বিয়ে করেছেন—এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছিল বলে পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই বিয়ের দাবির পক্ষে এমন কোনো সর্বজনগ্রাহ্য দলিল প্রকাশ্যে আসেনি, যার ভিত্তিতে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। বরং সময়ের সঙ্গে এ নিয়ে এসেছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। ২০২০ সালে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সালমান শাহর মৃত্যুর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পিবিআইয়ের তদন্তে শাবনূরের সঙ্গে সালমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উঠে আসে। তদন্তকারীদের ভাষ্য ছিল, এই সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সালমানের দাম্পত্যজীবনে অশান্তি তৈরি হয়েছিল। পিবিআই তখন সালমানের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে। পিবিআইয়ের ব্রিফিংয়ে সামিরা হকের বক্তব্যেরও উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, মৃত্যুর আগের দিন এফডিসিতে ‘প্রেম পিয়াসী’ ছবির ডাবিংয়ের সময় সালমান ও শাবনূরকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে সামিরা সেখান থেকে চলে যান। পরবর্তী সময়ে সালমান ও শাবনূরের সম্পর্ককে ঘিরে পারিবারিক টানাপোড়েনের কথাও তদন্তে আসে। শাবনূর অবশ্য এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন। ২০২০ সালে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সালমান ছিলেন তাঁর নায়ক, সহশিল্পী ও বন্ধু—এর বাইরে কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি আরও বলেন, সালমান তাঁর স্ত্রী সামিরাকে খুব ভালোবাসতেন এবং তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক থাকার কথা তিনি মানেন না। সালমান ও শাবনূরের গোপন বিয়ের দাবিও বিভিন্ন সময়ে নতুন করে সামনে এসেছে। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কয়েকজন ব্যক্তি দাবি করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রেম ছিল এবং তাঁরা গোপনে বিয়ে করেছিলেন। কেউ কেউ কক্সবাজারে শুটিংয়ের সময় বিয়ের কথাও বলেছেন। আবার এসব দাবির বিপরীতে শাবনূর সম্পর্কটিকে নিছক বন্ধুত্ব ও পেশাগত সম্পর্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে বিয়ের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত প্রমাণের অপেক্ষায় থাকা একটি বিতর্কিত দাবি। সালমানের মৃত্যুর আগের দিনটি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি ‘প্রেম পিয়াসী’ ছবির ডাবিংয়ে অংশ নেন। ছবিটিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন শাবনূর। সামিরা হক পরে দাবি করেন, সেদিন ডাবিং স্টুডিওতে শাবনূরের সঙ্গে সালমানের ঘনিষ্ঠ আচরণ দেখে তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে চলে যান। এই বক্তব্য পিবিআইয়ের তদন্ত-সংক্রান্ত আলোচনাতেও আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সে সময়ের এক প্রযোজক এবং সালমান পরিবারের ঘনিষ্ঠজন বলেন, ‘কাজ করতে গিয়ে সালমান ও শাবনূরের মধ্যে বেশ সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আমরা যতদূর জানি, ওরা চুটিয়ে প্রেম করতেন। শুটিং শেষে কিংবা শুটিং না থাকলে প্রায় রাতেই লং ড্রাইভে বেরিয়ে যেতেন। ওদের কিছু কমন জায়গার মধ্যে পুরোনো এয়ারপোর্টের ওখানে একটা কাবাবের দোকান ছিল। সেখানকার কাবাব শাবনূর বেশ পছন্দ করতেন। প্রায় রাতেই সেখানে শাবনূরকে সালমান নিয়ে যেতেন। ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের প্রেম ছিল ওপেন সিক্রেট। সে সময়ের অনেকেই তা জানতেন। শাবনূরের কারণে সালমান শাহর সুখের ঘরে অশান্তি তৈরি হয়েছিল।’ সে সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করে এই প্রযোজক আরও বলেন, ‘বিক্ষোভ সিনেমা দিয়ে সালমানের বিপরীতে দ্বিতীয়বারের মতো জুটি বাঁধেন শাবনূর। সে সময় শাবনূরের পারিশ্রামিক ছিল ২৫ হাজার টাকা, যা দিয়ে তার চলতে বেশ সমস্যা হতো। এ কথা সালমান জানার পর প্রযোজক ও পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে একই সিনেমায় শাবনূরের পারিশ্রমিক ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়। এরপরও খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন শাবনূর। সালমান বিষয়টি জানার পর শাবনূরের পারিশ্রমিক আরও দুই দফায় ২৫ করে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়। ঠিক এভাবেই তারা একে অপরের কাছাকাছি গিয়েছিলেন।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সে সময়ের এক নায়িকা বলেন, ‘সালমান ও শাবনূরের মধ্যে গভীর প্রেম ছিল এবং তারা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে ছিলেন। এ ঘটনা সে সময়ের অনেকেই জানেন। পরে শাবনূরের সঙ্গে সালমানের বিয়ের কাবিননামাও প্রকাশ হয়েছিল। কক্সবাজারে একটি সিনেমার শুটিংয়ে গিয়ে শাবনূরকে মসজিদে নিয়ে বিয়ে করেছিলেন সালমান। এই বিয়ের কথা পুরো ইন্ডাস্ট্রি জানে; কিন্তু সবাই আজ নীরব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা সত্যি যে, এসব নিয়ে সালমানের পারিবারিক দ্বন্দ্ব চরমে ছিল। তার মা নীলা চৌধুরী ছিলেন অশান্তির মূল কারণ। এখন অনেক কথাই বলা যাচ্ছে না। তবে তারা বিয়ে করেছেন এটা নিশ্চিত। ডনের সঙ্গে সামিরার যে ছবি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটা মূলত নায়িকা সাবরিনা। সামিরা সালমানকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। একটা সময় এই প্রেম নষ্ট হয়ে যায়। নীলা চৌধুরী শাবনূরের সঙ্গে সালমানের প্রেম-বিয়ে হোক এটা চেয়েছিলেন। সালমান-শাবনূরের প্রেম এফডিসিপাড়ার ‘টি বয়’ পর্যন্ত জানত। শাবনূর অনেক ধুরন্ধর ছিলেন। তবে এখন সবাই অস্বীকার করেন। সামিরা বিয়ের কথা জানার পর তারা এক রুমে ডাবিং করতেন না। একপর্যায়ে শাবনূরের সঙ্গে আর সিনেমা না করার সিদ্ধান্ত নেন সালমান। কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।’ তবে সালমানের মৃত্যুর সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি কারণগত সম্পর্ক ছিল—এমন সিদ্ধান্ত আলাদাভাবে প্রমাণিত নয়। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ বাসায় সালমান শাহকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যু নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। পুলিশ প্রথমে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করলেও পরিবার তা মেনে নেয়নি এবং হত্যার অভিযোগে মামলা করে। পরবর্তী সময়ে একাধিক দফায় তদন্ত হয়। পিবিআই ২০২০ সালে দীর্ঘ তদন্ত শেষে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। কিন্তু সালমানের মৃত্যুর রহস্য সেখানেই শেষ হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবার পিবিআইয়ের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে। ফলে মৃত্যুর কারণ এবং শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক—দুই বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় আসে। সালমান শাহ ও শাবনূরের সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে বড় জটিলতা এখানেই। একদিকে তদন্তে তাঁদের ঘনিষ্ঠতার কথা এসেছে, অন্যদিকে শাবনূর তা অস্বীকার করেছেন। আবার চলচ্চিত্র অঙ্গনের কয়েকজনের দাবি, তাঁদের সম্পর্ক ছিল প্রেমের এবং গোপনে বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু এসব দাবির মধ্যে কোনো একটি ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। সালমান শাহর চলচ্চিত্রজীবন ছিল মাত্র কয়েক বছরের। কিন্তু সেই স্বল্প সময়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা তাঁকে মৃত্যুর পরও দর্শকের কাছে অমর করে রেখেছে। শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটিও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত জুটিগুলোর একটি হয়ে আছে। জীবদ্দশায় সালমান শাহ সব সময়ই শাবনূরকে তার সেরা সহকর্মী এবং ভালো বন্ধু হিসেবে দাবি করে গেছেন। অন্যদিকে, সালমান শাহর মৃত্যুর পর বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শাবনূর প্রেমের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তার মতে, সালমান ছিলেন তার মেন্টর এবং ভাইয়ের মতো, যিনি তাকে অভিনয়ের খুঁটিনাটি শিখিয়েছেন। তবে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ও স্ত্রী সামিরা সব সময়ই সালমানের মৃত্যুর পেছনে শাবনূরের সঙ্গে এই সম্পর্ক ও মানসিক চাপকে দায়ী করে এসেছেন। সম্প্রতি সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ছেলে ও শাবনূরের সম্পর্ক প্রসঙ্গেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে মন্তব্য করেন নীলা চৌধুরী। তার দাবি, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। এনীলা চৌধুরী বলেন, ‘এগুলো বাজে কথা। এসব বাদ দাও। তৃতীয় শ্রেণির মেয়ে শাবনূরকে আমার ছেলে কেন বিয়ে করবে? যদিও সামিরাও তৃতীয় শ্রেণির ছিল। ওকে বিয়ে করেছিল বলেই আজ এই দশা।’ শাবনূরকে নিয়ে কিছু অভিযোগও করেন সালমানের মা। তার দাবি, শাবনূর কখনো কখনো সালমানের সঙ্গে তার বিশেষ কোনো সম্পর্ক রয়েছে এমন ধারণা তৈরির চেষ্টা করতেন। পরবর্তী সময়ে তাদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিভিন্ন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পর্দার সেই জনপ্রিয় রসায়নের আড়ালে সত্যিই কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি না, গোপনে বিয়ে হয়েছিল কি না কিংবা তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সালমানের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছিল—এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর আজও অমীমাংসিত। আর সেই অমীমাংসিত প্রশ্নই সালমান শাহ–শাবনূরের গল্পকে তিন দশক পরও ঢালিউডের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় করে রেখেছে।