দীর্ঘ ১০ মাস পর পর্যটকদের পদচারণায় আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে। শুক্রবার দ্বিতীয় দিনে তিনটি জাহাজে দেড় হাজারের বেশি পর্যটক দ্বীপটিতে গেছেন। তবে পর্যটক পরিবহন, যাত্রী গণনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি দেখা গেছে। ট্রাভেল পাসের কিউআর কোড স্ক্যান করা হচ্ছে না। অন্যদিকে, পর্যটকদের যাতায়াত নিষিদ্ধ থাকলেও ছেঁড়াদিয়ায় অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন অনেকে। শুক্রবার সেন্টমার্টিন রুটে এমভি বারো আউলিয়ার পাশাপাশি চলাচল করেছে এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, তিনটি জাহাজে এদিন ১ হাজার ৬১২ জন পর্যটক দ্বীপে গেছেন। তবে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) হিসাবে এ সংখ্যা ১ হাজার ৫৩০ এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাবে ১ হাজার ৫৫৪ জন। কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে দায়িত্ব পালনকালে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ জনী বলেন, তাঁদের হিসাবে ১ হাজার ৬১২ জন পর্যটক সেন্টমার্টিন গেছেন। তিনি জানান, জাহাজে ওঠার সময় ট্যুরিজম বোর্ডের ট্রাভেল পাসের কিউআর কোড স্ক্যান করা হচ্ছে না। ফলে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পর্যটক গণনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কিউআর কোড স্ক্যানের ব্যবস্থা চালু করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিগগিরই এ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল ও যাত্রী যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে বিশেষ তদারকি কমিটির আহ্বায়ক কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, সেন্টমার্টিনের বিষয়ে সরকারের একাধিক নির্দেশনা পরিবর্তন হয়েছে। তদারকি কমিটির বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা আসেনি। আগের সিদ্ধান্ত বহাল আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেন্টমার্টিনের বিষয়ে সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। চলতি মৌসুমে শুক্রবার সকালে নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছেঁড়াদিয়ায় পর্যটক সেন্টমার্টিন দ্বীপের আয়তন প্রায় আট বর্গকিলোমিটার। বঙ্গোপসাগরের এ দ্বীপের দক্ষিণে রয়েছে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ছেঁড়াদিয়া। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত নিষিদ্ধ। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই প্রতিদিন শত শত পর্যটক ছেঁড়াদিয়ায় যাচ্ছেন। শুক্রবার সকাল ১০টায় ছেঁড়াদিয়ায় গিয়ে বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। কেউ পাথরের স্তূপে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছেন। সেন্টমার্টিনে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন নিষিদ্ধ। এ ছাড়া কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর দ্বীপ দীর্ঘ বিরতির পর সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের উপস্থিতিতে স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ব্যস্ততা ফিরেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকেরা দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এসে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তামান্না রহমান। তিনি বলেন, জীবনে প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এসেছেন। সেন্টমার্টিনের মতো সুন্দর জায়গায় আসতে পেরে তিনি ভীষণ আনন্দিত। দ্বীপে এসে ফুল উপহার পাওয়ায় তাঁর আনন্দ আরও বেড়েছে বলেও জানান তিনি। ফারাহ খানম নামের আরেক পর্যটক বলেন, এখানকার নীল সমুদ্রের দৃশ্য অসাধারণ। সেন্টমার্টিনে অনেক ছবি তুলে সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে চান তিনি। সেন্টমার্টিন দ্বীপের হোটেল-রিসোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি কেফায়েত উল্লাহ বলেন, পর্যটকেরা যাতে হয়রানির শিকার না হন এবং নির্বিঘ্নে দ্বীপে চলাফেরা ও যথাযথ সেবা পান, সে বিষয়ে তাঁরা নজরদারি করছেন। পর্যটকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন, এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।