বিএফআইইউকে ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ ও সম্পদের নথি দিতে চিঠি; অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে কমিশন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তাঁর স্ত্রীর দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা ও অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) এসব তথ্য দিতে বলা হয়েছে। দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা চিঠির সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বৃহস্পতিবার দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিএফআইইউকে পাঠানো চিঠিতে আসিফ মাহমুদ ও তাঁর স্ত্রীর নামে দেশের সব ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা চালু, সুপ্ত ও বন্ধ—সব ধরনের হিসাবের বিস্তারিত তথ্য দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, লকার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, ডিপিএস এবং ঋণসংক্রান্ত নথির তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ দেশে তাঁদের কোনো ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ বা সম্পদ রয়েছে কি না, সে-সংক্রান্ত তথ্যও চেয়েছে দুদক। চিঠিতে পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা, অর্থ পাচার এবং কথিত ‘শেল কোম্পানি’ গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলিল ও রেকর্ডপত্রের তথ্য চাওয়া হয়েছে। বিদেশি সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সংগৃহীত কোনো তথ্য থাকলে সেটিও দিতে বলা হয়েছে। দুদকের চিঠিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থ পাচার, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং বিদেশে শেল কোম্পানি গঠনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়নি। কমিশন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্যই বিভিন্ন সংস্থা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অনুসন্ধানে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহেদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। পরদিন তাঁর দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ে সম্পন্ন হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসহ বিভিন্ন নথি চেয়ে চিঠি দেয় কমিশন। দুদকের অনুসন্ধান দল এরই মধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে সম্পন্ন হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে ১৩ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারসহ নতুন কয়েকটি অভিযোগেরও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এসব অভিযোগ আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার কথা জানিয়েছে কমিশন। দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বিশ্বের পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের দাবি করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে সম্পদ কেনা ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। তবে অভিযোগে উল্লেখ করা এসব অর্থের পরিমাণ ও সম্পদ অর্জনের তথ্য এখনো অনুসন্ধানাধীন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদের দুই বোনজামাই ও এক ভাগনিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর নিজ উপজেলা মুরাদনগরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ও পিএ মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার সম্পৃক্ততার দাবিও অভিযোগে করা হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, অনুসন্ধানের মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় ডিসি পদায়ন এবং ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানে রয়েছে বলে জানা গেছে। দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান ১৫ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে এবং অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলআর) পাঠানো হতে পারে বলেও জানান তিনি। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব জানিয়েছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ে ‘আমলযোগ্য’ বিবেচিত হওয়ায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি অভিযোগগুলো নিয়ে দুদকের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশও দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের ফলাফল বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশের আগেই অভিযোগগুলোকে সামনে আনা হয়েছে। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। এখন বিএফআইইউ থেকে পাওয়া ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য দুদকের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিদেশে অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন বা অন্য কোনো দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে অনুসন্ধান ও পরবর্তী তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে।