ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার বার্তা দেয় ইরান। এর পরপরই বিশ্ববাজারে একদিনে জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো জ্বালানি মজুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে ঝুঁকি বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে, তাতে স্বল্পমেয়াদে বড় সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এলএনজির একটি বড় অংশ কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। বিকল্প উৎস হিসেবে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের কথা বলা হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সব দেশ একই দিকে ঝুঁকলে সরবরাহে চাপ তৈরি হবে এবং দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে ব্যয় বাড়বে। বাণিজ্য ও শিল্পখাতে প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, খাদ্যপণ্য ও ওষুধ রপ্তানি বাণিজ্য রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, সরাসরি পণ্য পরিবহনে বড় সমস্যা না হলেও জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শিপিং খাত সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, তেলের দাম বাড়লে জাহাজভাড়া বেড়ে যাবে। ফলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যমূল্য বাড়াতে পারে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিতে সামগ্রিক প্রভাব বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুরশিদ বলেন, “জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে গেলে এর প্রভাব সব অর্থনৈতিক সূচকে পড়বে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি মজুত বাড়ানো এবং বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।” তিনি আরও বলেন, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কৌশল গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এমন সংকটে বড় ধাক্কা খেতে হতে পারে। হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে যায়। ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ এটি। অতীতে বিভিন্ন সংঘাতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি দিলেও পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রস্তুতির তাগিদ সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত আতঙ্কের কারণ নেই। তবে পরিস্থিতি জটিল হলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য মজুত বাড়ানো, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন এবং বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানিতে নয়—শিল্প, পরিবহন, কৃষি ও ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। তাই ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।