চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ভবনে কর্মরত শ্রমিকদের মারধর করা হয় এবং হাসান সাকি নামের এক নির্মাণশ্রমিককে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আহত করেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। রোববার সকাল আটটার দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড়–ভাটিয়ারী লিংক রোডসংলগ্ন একটি আবাসিক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন চাল ও চিনির পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোববার সকালে মুখে মাস্ক পরা ৮ থেকে ১০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি একটি টেম্পোযোগে জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনের সামনে আসে। ওই সময় ভবনটিতে নির্মাণশ্রমিকেরা কাজ করছিলেন। সশস্ত্র ব্যক্তিরা ভবনের ভেতরে ঢুকে শ্রমিকদের মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে হামলাকারীরা ভবনের দরজা ও জানালা ভাঙচুর করে। এ সময় নির্মাণশ্রমিক হাসান সাকিকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। ভবনের নিরাপত্তাকর্মীসহ আরও কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করে হামলাকারীরা। পরে ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার সময় তিনটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। হামলার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, বাড়িটিতে হামলার ঘটনা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে। হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, প্রায় এক মাস ধরে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে তাঁর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল সন্ত্রাসীরা। চাঁদা না দিলে নানা ধরনের হুমকিও দেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি করেন তিনি। জসিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম নগরের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনার পর চাঁদাবাজেরা কিছুদিন নীরব ছিল। তবে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আবারও তাঁকে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। বিষয়টি তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, রোববারের হামলার ঘটনায় থানায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে কারা তাঁকে ফোন করে চাঁদা দাবি করেছে, সে বিষয়ে তিনি কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবন নয়, বড় দিঘিরপাড় এলাকায় নির্মাণাধীন আরও অন্তত ৮ থেকে ১০টি ভবনের মালিকের কাছেও ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ চাঁদা দিয়েছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি। স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, স্বাধীনতার পর থেকে তাঁদের এলাকায় এ ধরনের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার ঘটনা তাঁরা দেখেননি। সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগে তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ## এর আগে ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে আলোচনায় আসে নগরের চকবাজার এলাকার একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা। গত ১৩ জুলাই নগরের চকবাজার অ্যাকসেস রোডে ডিডিএন নামের ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের পর র্যাব ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ করে ডিডিএনের কার্যালয়ে প্রবেশ করে। হামলাকারীদের অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। তারা অফিসের কম্পিউটার, আসবাব ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাঙচুর করে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখায়। সিসিটিভি ফুটেজে একজনকে কুড়াল দিয়ে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে আঘাত করতে দেখা যায়। ওই ঘটনায় করা মামলায় সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ইমন চাঁদা দাবি করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। তবে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে ইমন পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে ভিন্ন বক্তব্য দিতে শোনা যায়। ওই অডিওতে তিনি দাবি করেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ছুরি ও কিরিচ নিয়ে হামলা করা তাঁদের ধরন নয় এবং তাঁদের হামলার ধরন সম্পর্কে পুরো চট্টগ্রামবাসী জানে। এদিকে, বড় দিঘিরপাড় এলাকায় ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে নতুন করে হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত হামলাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে পারলে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের একটি বড় নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।