চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় সরকারি কলেজের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে রয়েছে। উপজেলার দুটি কলেজ ও তিনটি মাদ্রাসার ফলাফল বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে সদরপুর সরকারি কলেজের ফলাফল বিপর্যয় এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে কী কী কারণ—তা নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলে চলছে আলোচনা। শনিবার (১ নভেম্বর) সকাল ১১টায় প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, উপজেলার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার অর্জন করেছে চরবন্দরখোলা ফাজিল মাদ্রাসা। অন্যদিকে সবচেয়ে কম পাসের হার সদরপুর মহিলা কলেজে। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, সদরপুর সরকারি কলেজ থেকে এ বছর ৭০১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ২৯১ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৪১ দশমিক ৫১ শতাংশ। অপরদিকে সদরপুর মহিলা কলেজে ৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১০ জন। পাসের হার ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে উপজেলার তিনটি মাদ্রাসার ফলাফল তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক। চরবন্দরখোলা ফাজিল মাদ্রাসায় ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৯১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বিশ্ব জাকের মঞ্জিল আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় ২৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২১ জন। পাসের হার ৮৪ শতাংশ। চন্দ্রপাড়া সুলতানিয়া মাদ্রাসায় ১৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৩ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৭২ দশমিক ২২ শতাংশ। ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, উপজেলার তিনটি মাদ্রাসার পাসের হার ৭২ থেকে ৯২ শতাংশের মধ্যে থাকলেও দুটি কলেজের পাসের হার ২২ থেকে ৪২ শতাংশের মধ্যে। বিশেষ করে সদরপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী পাস করায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠদানের পরিবেশ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা অভিযোগ: কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানটিতে লেখাপড়ার পরিবেশ ও পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। কলেজটিতে মোট ৩৫ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্যমতে, বিজ্ঞান বিভাগে ৯ জন শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯ জন। অথচ এ বিভাগ থেকে এবার পাস করেছে মাত্র একজন। ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগেও ফলাফল বিপর্যয়ের চিত্র দেখা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, কলেজের শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করে শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর পাঠদান এবং শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত অতিথি শিক্ষক দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের একদিকে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তারা মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। সাক্ষাৎকারে কয়েকজন শিক্ষার্থী আরও অভিযোগ করেন, কলেজ কর্তৃপক্ষের কিছু শিক্ষার্থীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কারণে অনিয়মের বিরুদ্ধে অন্যরা কথা বলার সাহস পান না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বুলিংয়ের শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা। প্রশ্নের মুখে শিক্ষার পরিবেশ ও জবাবদিহি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার পরও কেন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছে না, নিয়মিত পাঠদান কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল। একই সঙ্গে কলেজের পাঠদান কার্যক্রম, শিক্ষকদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের ব্যবহার এবং অতিরিক্ত কোচিংনির্ভরতা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, শিক্ষার মানোন্নয়নে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতেও এমন ফলাফল বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সদরপুর সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।