প্রকাশ :: ... | ... | ...

সময়ের হিসাবে বড় বদল


সংযুক্ত ছবি

২০২৭ সালের ২০ মে থেকে বন্ধ হচ্ছে লিপ সেকেন্ডের ব্যবহার, তবে এখনই ঘড়িতে এক ঘণ্টা যোগ হচ্ছে না সময় গণনার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে ঘড়ির সময়ের ব্যবধান কমিয়ে রাখতে এত দিন প্রয়োজনে এক সেকেন্ড যোগ করা হতো। এবার সেই পদ্ধতি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের সময় নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ। নতুন ব্যবস্থায় পারমাণবিক ঘড়ির ভিত্তিতে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর ঘূর্ণনভিত্তিক সময়ের ব্যবধান সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারবে। আগামী ২০ মে থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। গত ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে অনুষ্ঠিত ওজন ও পরিমাপবিষয়ক সাধারণ সম্মেলনে (সিজিপিএম) এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিক পরিমাপব্যবস্থার সমন্বয়কারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অব ওয়েটস অ্যান্ড মেজারসের (বিআইপিএম) প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২০ মে থেকে সমন্বিত বিশ্বসময় বা ইউটিসি চলবে নতুন ধারাবাহিক ব্যবস্থায়। এর ফলে সময়ের হিসাব মেলাতে আর লিপ সেকেন্ড যোগ বা বিয়োগ করতে হবে না। সংবাদমাধ্যমে এই পরিবর্তনকে ‘লিপ আওয়ার’ বলা হচ্ছে। তবে নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট কোনো দিনে সবার ঘড়িতে এক ঘণ্টা যোগ হবে। সূত্র: নেচার, বিআইপিএম। সময়ের হিসাব বদলাচ্ছে কেন আমরা সাধারণত দিনে ২৪ ঘণ্টা হিসাব করি। কিন্তু পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে সব সময় একই গতিতে ঘোরে না। চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গতিশীলতাসহ বিভিন্ন কারণে ঘূর্ণনের গতিতে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণনভিত্তিক সময় ও অত্যন্ত নির্ভুল পারমাণবিক ঘড়ির সময়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে দুটি সময়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক ঘড়ির ভিত্তিতে নির্ধারিত সমন্বিত বিশ্বসময় বা ইউটিসি আন্তর্জাতিকভাবে সময় গণনা ও সমন্বয়ের প্রধান মান। অন্যদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়কে বলা হয় ইউটি১। সূর্যের অবস্থান ও পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সময়ের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে ইউটি১ গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই সময়ের ব্যবধান সাধারণত খুব কম রাখতে এত দিন লিপ সেকেন্ড ব্যবহার করা হতো। পৃথিবীর ঘূর্ণনভিত্তিক সময়ের সঙ্গে ব্যবধান নির্ধারিত সীমার কাছাকাছি পৌঁছালে আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ ইউটিসিতে এক সেকেন্ড যোগ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারত। ১৯৭২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লিপ সেকেন্ডের ব্যবহার শুরু হয়। এরপর মোট ২৭ বার অতিরিক্ত এক সেকেন্ড যোগ করা হয়েছে। সর্বশেষ লিপ সেকেন্ড যোগ করা হয় ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের শেষে। এক সেকেন্ডেই প্রযুক্তিতে বিপত্তি শুনতে সামান্য মনে হলেও কম্পিউটার ও যোগাযোগব্যবস্থায় সময়ের নির্ভুল হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট সার্ভার, ব্যাংকিং লেনদেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, টেলিযোগাযোগ এবং উপগ্রহনির্ভর নেভিগেশন—সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন যন্ত্র ও ব্যবস্থার মধ্যে সময়ের সমন্বয় বজায় রাখতে হয়। লিপ সেকেন্ড যোগ করার সময় সব কম্পিউটার ব্যবস্থা একইভাবে তা সামলাতে পারে না। কোনো সফটওয়্যার বাড়তি এক সেকেন্ডকে ভুলভাবে প্রক্রিয়া করলে সময়ের হিসাব গুলিয়ে যেতে পারে। এতে সার্ভার, ডেটাবেইস ও অনলাইন সেবায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০১২ সালে লিপ সেকেন্ড যোগ করার পর রেডিট ও লিংকডইনসহ কয়েকটি অনলাইন সেবায় প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিমান সংস্থা কোয়ান্টাসের ফ্লাইট পরিচালনাতেও বিঘ্নের খবর পাওয়া যায়। এসব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত প্রযুক্তি অবকাঠামোয় সময়ের আকস্মিক পরিবর্তন সামলানো সহজ নয়। এবার আশঙ্কা ছিল উল্টো হিসাবের লিপ সেকেন্ডের প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল মূলত পৃথিবীর ঘূর্ণন ও পারমাণবিক ঘড়ির সময়ের ব্যবধান সামলাতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতিতে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে, যাতে ভবিষ্যতে সময়ের হিসাবে এক সেকেন্ড যোগ করার বদলে এক সেকেন্ড বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের সমন্বয়কে বলা হয় ‘নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড’। এখন পর্যন্ত কখনো নেগেটিভ লিপ সেকেন্ড প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে এমন পরিবর্তন কার্যকর করতে গেলে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত কম্পিউটার, যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রযুক্তি অবকাঠামোয় কী ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সময়ের সমন্বয়ের জন্য আলাদা আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করলে বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে অসামঞ্জস্যও তৈরি হতে পারে। এই ঝুঁকি কমানোই নতুন সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য। নির্দিষ্ট বিরতিতে এক সেকেন্ড যোগ বা বিয়োগ না করে ইউটিসিকে ধারাবাহিকভাবে চলতে দেওয়ার ফলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় সময়ের আকস্মিক পরিবর্তনের প্রয়োজন কমবে। এক ঘণ্টার ব্যবধান মানে কী নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউটিসি ও পৃথিবীর ঘূর্ণনভিত্তিক সময় ইউটি১-এর ব্যবধান সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬০০ সেকেন্ড বা এক ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারবে। আগে এ ব্যবধান এক সেকেন্ডের কাছাকাছি সীমার মধ্যে রাখার ব্যবস্থা ছিল। নতুন নিয়মে সময়ের দুই হিসাবের মধ্যে ব্যবধান ধীরে ধীরে বাড়তে দেওয়া হবে। এর অর্থ এই নয় যে ২০২৭ সালের ২০ মে দিন ২৫ ঘণ্টার হয়ে যাবে কিংবা সেদিন সব ঘড়িতে এক ঘণ্টা যোগ হবে। মানুষের দৈনন্দিন সময়, অফিস-আদালতের সূচি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা ব্যাংকিং লেনদেনের সময়ও ওই দিন হঠাৎ বদলে যাবে না। বরং পারমাণবিক ঘড়ির সময়কে ধারাবাহিক রেখে পৃথিবীর ঘূর্ণনভিত্তিক সময়ের সঙ্গে ব্যবধান বাড়তে দেওয়াই নতুন ব্যবস্থার মূল কথা। ব্যবধান এক ঘণ্টার সীমার কাছে পৌঁছালে ভবিষ্যতে কীভাবে তা সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এক ঘণ্টার ব্যবধান তৈরি হতে বহু শতাব্দী সময় লাগতে পারে। তবে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি স্থির নয় বলে ঠিক কত সময়ে এই সীমায় পৌঁছানো হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। সময় গণনায় নতুন অধ্যায় ১৫ অক্টোবরের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সময় গণনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি পদ্ধতি থেকে সরে আসার পথ তৈরি হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক ঘড়ির নির্ভুলতা বজায় রাখা নয়; বরং বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন, উপগ্রহ এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় সময়ের নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয় নিশ্চিত করা। পৃথিবীর ঘূর্ণন ও পারমাণবিক সময়ের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ অবশ্য বন্ধ হবে না। জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান ও নেভিগেশনের মতো ক্ষেত্রে পৃথিবীর ঘূর্ণনভিত্তিক সময়ের গুরুত্ব থাকছেই। পরিবর্তনটি মূলত আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ইউটিসিকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সেই ব্যবস্থায়। মানুষের ঘড়িতে এখনই এক ঘণ্টা যোগ হচ্ছে না। তবে ২০২৭ সালের ২০ মে থেকে লিপ সেকেন্ডের বদলে ধারাবাহিক ইউটিসি চালুর মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে সময় গণনার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কার্যকর হতে যাচ্ছে।