মহাকাশে ছুটে আসছিল ভারতের একটি পুরনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। মুহূর্তে মুহূর্তে সেটি এগিয়ে আসছিল বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)-এর দিকে। একপর্যায়ে দুই মহাকাশযানের দূরত্ব নেমে আসে মাত্র ৮৫২ মিটারে। সামান্য বিচ্যুতি হলেই ঘটতে পারত সংঘর্ষ। ঝুঁকি এড়াতে শেষ পর্যন্ত কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন এনে নিরাপদ রাখা হয় বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটিকে। গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম স্পেস ট্র্যাকার থেকে এমন সতর্কবার্তা পায় বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)। এরপর টানা চার দিন গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশনে ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে ছিলেন প্রকৌশলীরা। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলামোটরে বিএসসিএলের কার্যালয়ে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান। তিনি বলেন, ওই কয়েকটি দিন অত্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে। হাতে সময়ও কম ছিল, আবার বিএস-১-কে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও ছিল সীমিত। শেষ পর্যন্ত কোনো বিপদ ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার করা সম্ভব হয়েছে। বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, কাছাকাছি চলে আসা ধ্বংসাবশেষটি ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের। ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণের কয়েক মাস পরই স্যাটেলাইটটিতে সমস্যা দেখা দেয়। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর এটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। এরপর এর বিভিন্ন অংশ মহাকাশে ভাসমান ধ্বংসাবশেষ হিসেবে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর বিএসসিএলের প্রকৌশলীরা প্রথমে ধ্বংসাবশেষটির সম্ভাব্য গতিপথ এবং বিএস-১-এর অবস্থান বিশ্লেষণ শুরু করেন। তখন মূল চ্যালেঞ্জ ছিল শুধু স্যাটেলাইটকে সরিয়ে নেওয়া নয়; বরং কোন দিকে এবং কতটা সরালে ঝুঁকি কমবে, নতুন অবস্থানে অন্য কোনো মহাকাশ বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হবে কি না এবং কক্ষপথ পরিবর্তনে কতটা জ্বালানি ব্যয় হবে—সবকিছু একসঙ্গে হিসাব করা। বিশ্লেষণের পর ১৩ আগস্ট বিএস-১-এর কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করে বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার না হওয়া পর্যন্ত স্যাটেলাইটটিকে ওই অবস্থানে রাখা হয়। ধ্বংসাবশেষটি নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার পর আবার বিএস-১-কে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ইমাদুর রহমান জানান, সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রকৌশলীদের ছুটি বাতিল করা হয়। ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা হয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। স্পেস ট্র্যাকার থেকেও নিয়মিত ধ্বংসাবশেষটির অবস্থান ও গতিপথের তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান বলেন, মহাকাশে সংঘর্ষ এড়ানো শুধু একটি স্যাটেলাইটকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ কক্ষপথ পরিবর্তন এবং সীমিত জ্বালানি ব্যবহারের বিষয় জড়িত। বিএস-১-এর ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে এসব বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমানও বলেন, মহাকাশে কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছে চলে এলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো জটিল প্রক্রিয়া। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় বিএস-১। ২০২১ সাল থেকে স্যাটেলাইটটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বিএসসিএল। গাজীপুরের জয়দেবপুরে স্থাপিত গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী ২৪ ঘণ্টা স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। তবে এবারই প্রথম বিএস-১-এর সামনে এমন ঝুঁকি তৈরি হয়নি। বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২৫ সালেও মহাকাশের অন্য বস্তুর সঙ্গে স্যাটেলাইটটির সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২১ সালে ছিল রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। মহাকাশে সক্রিয় স্যাটেলাইটের পাশাপাশি পরিত্যক্ত স্যাটেলাইট, রকেটের বিভিন্ন অংশ ও অন্যান্য বস্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব মহাকাশ ধ্বংসাবশেষ কার্যকর স্যাটেলাইটের জন্য ক্রমেই বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের বিএস-১-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাও দেখিয়ে দিল, মহাকাশে একটি স্যাটেলাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু উৎক্ষেপণ ও কক্ষপথে স্থাপনই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে কক্ষপথ পরিবর্তনের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।