প্রকাশ :: ... | ... | ...

সালমান শাহর মৃত্যু : তিন দশকেও ঘোর কাটেনি ‘রহস্যের’, জট খুলবে কি এবার?


সংযুক্ত ছবি

ঢালিউডের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সালমান শাহর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি হত্যা—এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। তাঁর পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে এ পর্যন্ত হওয়া একাধিক তদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সবশেষ ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালতের নির্দেশে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হয়। মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ কয়েক দফা পিছিয়েছে। সর্বশেষ আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। ২৫ বছর বয়সে মৃত্যু সালমান শাহর পারিবারিক নাম শহীদ চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে তাঁর জন্ম। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহর। মাত্র চার বছরের অভিনয়জীবনে একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার বাসায় তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা হয়। তবে সালমান শাহর মা-বাবা শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন, এটি আত্মহত্যা নয়, হত্যাকাণ্ড। প্রথম তদন্তে আত্মহত্যার কথা সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সংস্থাটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর পরিবার। তাঁর বাবা আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। এর আগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই সালমান শাহর বাবা আদালতে আবেদন করে অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। বিচার বিভাগীয় তদন্ত ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৪ সালে দেওয়া প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রতিবেদনও মেনে নেয়নি তাঁর পরিবার। ২০১৫ সালে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। এরপর ২০১৬ সালে আদালত মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআইয়ের প্রতিবেদন প্রায় চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণের কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর পরিবার। পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২৯ বছর পর হত্যা মামলা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আগের তদন্তে আসামিদের অব্যাহতির আদেশের বিরুদ্ধে করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করা হয়। এরপর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাঁরা হলেন সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, অভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ওরফে ডন, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আবদুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান। একজন গ্রেপ্তার হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত ৯ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। পরে তদন্তের স্বার্থে তাঁর সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। গত ২৭ আগস্ট আদালত তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে সিআইডি এখনো তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান বলেন, আদালত ডনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় জনবলের বিষয় বিবেচনা করে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ডনের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম দাবি করেছেন, এ পর্যন্ত হওয়া তদন্ত প্রতিবেদনগুলোতে সালমান শাহর আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মক্কেল এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর জামিনের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে। রেজভির জবানবন্দি নিয়ে বিতর্ক সালমান শাহ হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান দাবি করেছেন, মামলার আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ ১৯৯৭ সালে একটি অপহরণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই মামলায় তাঁর দেওয়া জবানবন্দিতে সালমান শাহ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা উঠে এসেছিল বলে দাবি করেন তিনি। রেজভি বর্তমানে পলাতক। বাদীপক্ষের আইনজীবীর দাবি, তাঁর ওই জবানবন্দিও সালমান শাহ হত্যার অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তবে দীর্ঘদিন ধরে সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে হওয়া তদন্তগুলোর কোনোটিতেই হত্যার অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। ৩০ বছর পরও অপেক্ষা সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বর্তমানে লন্ডনে আছেন। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ৩০ বছর ধরে তিনি ছেলের হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। হত্যা মামলায় মাত্র একজন আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, মামলার প্রধান আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। নীলা চৌধুরীর ভাষ্য, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাঁর ছেলের মৃত্যুর রহস্য বেরিয়ে আসবে। তিনি দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচার শুরুর দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা বলছেন, নতুন হত্যা মামলার তদন্তের ফলের ওপরই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নির্ভর করবে। এখন নজর তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুর পর গত ৩০ বছরে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও পিবিআই—একাধিক পর্যায়ে তদন্ত হয়েছে। এসব তদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যু বলা হলেও পরিবারের আপত্তির কারণে আইনি প্রক্রিয়া থামেনি। সবশেষ আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন তদন্তকারী সংস্থা কী তথ্য-প্রমাণ পায় এবং সেই ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর তারিখ ধার্য রয়েছে। তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের আইনি সমাধানের দিকে এখন তাই নজর সংশ্লিষ্ট সবার।