প্রকাশ :: ... | ... | ...

বিশ্বের স্থপতিদের হতবাক করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করল গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি


সংযুক্ত ছবি

পরিবেশবান্ধব প্রকৃতি, শ্রমিকের স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক মর্যাদাকে স্থাপত্যের কেন্দ্রে রেখে তৈরি সাততলা গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি জিতেছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার। কী আছে এই ভবনে, যা বদলে দিতে পারে শিল্পকারখানা নির্মাণের প্রচলিত ধারণা? বাংলাদেশে কারখানা বলতে সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে বড় একটি ভবন, উৎপাদনের সারি, যন্ত্রপাতির শব্দ আর কর্মব্যস্ত শ্রমিকদের ছবি। সেখানে আলো-বাতাস, বিশ্রাম, সবুজ প্রকৃতি কিংবা শ্রমিকদের দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্য কতটা গুরুত্ব পায়, তা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। অথচ রংপুরের একটি কারখানা দেখিয়েছে, উৎপাদনের জায়গাকেও মানুষের বসবাসের মতো আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা সম্ভব। কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের সাততলা এই ভবনটি হাতে তৈরি কার্পেট, শতরঞ্জি ও অন্যান্য বস্ত্রপণ্য উৎপাদনের জন্য নির্মিত। গত ১৫ অক্টোবর লন্ডনের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের (আরআইবিএ) ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে ভবনটি। আন্তর্জাতিক স্থাপত্যের জগতে এটি অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। বিচারকেরা সর্বসম্মতভাবে ভবনটিকে বিজয়ী নির্বাচন করেন। তাঁদের ভাষায়, এটি শান্ত ও নম্র স্থাপত্যকর্ম, যার শক্তি চোখধাঁধানো নকশায় নয়, বরং মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যে। প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটের এই কারখানায় কাজ করেন কয়েক হাজার মানুষ, যাঁদের অধিকাংশ নারী। তবে ভবনটির বিশেষত্ব শুধু এর আয়তন কিংবা উৎপাদনক্ষমতা নয়। স্থাপত্যের প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এখানে কারখানাকে এমন একটি জায়গা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে মানুষ শুধু কাজ করবেন না, বরং স্বস্তি পাবেন, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকবেন এবং নিজেদের কর্মস্থল নিয়ে গর্বও করতে পারবেন। বাড়ির মতো কারখানা ভবনটির নকশা করেছেন ঢাকার স্থপতি আর্কিটেক্টসের প্রধান স্থপতি বাজিদ মাহবুব খান। তাঁর নকশায় বাংলাদেশের স্থানীয় পরিবেশ, মানুষের জীবনযাপন ও ঐতিহ্যের প্রভাব দেখা যায়। গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির ক্ষেত্রেও তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন বাংলার চিরচেনা বসতবাড়ি থেকে। বাজিদ মাহবুবের ভাবনাটি ছিল সহজ, কিন্তু প্রচলিত শিল্পস্থাপত্যের ধারণার বাইরে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কারখানাটি যদি প্রথম থেকেই সেখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের বাড়ি হিসেবে কল্পনা করে তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি কেমন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কারখানাটিতে যুক্ত হয়েছে উঠান, বারান্দা, বাগান, জলাধার ও সবুজে ঢাকা দেয়াল। সাততলা ভবনের ভেতরে রয়েছে উঁচু ও খোলামেলা জায়গা বা অ্যাট্রিয়াম, যেগুলো ভবনের গভীরে আলো পৌঁছাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন তলার কাজের জায়গা থেকেও বাইরের সবুজ পরিবেশ দেখার সুযোগ রয়েছে। সাধারণ কারখানায় যেখানে প্রতিটি বর্গফুট জায়গা উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে গ্রিন ফিল্ডে বিশ্রাম, চলাচল ও সামাজিক যোগাযোগের জন্যও জায়গা রাখা হয়েছে। ভবনটির নকশায় তাই শুধু উৎপাদনদক্ষতা নয়, কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, প্রকৃতিকে ভবনের বাইরের সাজসজ্জা হিসেবে না রেখে নকশার কার্যকর অংশ করে তোলা। ভবনের দেয়ালজুড়ে রয়েছে গাছপালা। এগুলো সরাসরি সূর্যের তাপ কমাতে ও ছায়া তৈরি করতে সাহায্য করে। গভীর বারান্দা, উঠান এবং খোলা জায়গার সমন্বয়ে ভবনের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে দিনের বেলায় কৃত্রিম আলোর ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক বাতাস ব্যবহার করে কর্মক্ষেত্রকে আরামদায়ক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ভবনের ভেতরে জলাধার ও পুকুরের মতো জলপৃষ্ঠও রয়েছে। এসব জলাধারের পাশ দিয়ে আসা বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভবনের উঁচু খোলা অংশ দিয়ে গরম বাতাস বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। স্থাপত্যের ভাষায় এ ধরনের প্রক্রিয়াকে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ও স্ট্যাক ইফেক্ট বলা হয়। এতে যান্ত্রিক শীতাতপনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। এখানে গাছপালা ও প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহারকে বলা হয় বায়োফিলিক ডিজাইন, অর্থাৎ স্থাপত্যের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক তৈরি করা। এর লক্ষ্য শুধু ভবনকে সুন্দর করা নয়, আলো, বাতাস, সবুজ, পানি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ বাড়িয়ে কাজের পরিবেশ উন্নত করা। ভবনটিতে বৃষ্টির পানি ব্যবহার এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও রয়েছে। আরআইবিএর তথ্য অনুযায়ী, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ভবনটি লিড প্ল্যাটিনাম সনদ অর্জন করেছে। তবে এসব ব্যবস্থার বাস্তব জ্বালানিসাশ্রয়, পানির ব্যবহার এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাত্রা জানতে ভবনটির পরিচালনাসংক্রান্ত পরিমাপযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। শ্রমিক-মালিকের একই প্রবেশপথ ভবনটির নকশায় সামাজিক মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকদের প্রবেশপথ আলাদা থাকে। এতে কর্মক্ষেত্রের স্তরবিন্যাস স্থাপত্যের মধ্যেও প্রকাশ পায়। গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত বিভাজনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এখানে শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিকের জন্য একই প্রবেশপথ রাখা হয়েছে। প্রবেশের জায়গায় রয়েছে দুটি বড় সিঁড়ি, যা সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য প্রবেশের ধারণাকে সামনে আনে। আরআইবিএর বিচারকদের মতে, এই নকশা কর্মক্ষেত্রের প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এবং সবার জন্য একটি অভিন্ন পরিসর তৈরি করেছে। ভবনটিতে শুধু কাজের জায়গা নয়, কর্মীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কথাও ভাবা হয়েছে। রয়েছে চিকিৎসাকেন্দ্র, শিশুদের দেখাশোনার জন্য ডে-কেয়ার, ক্যানটিন, প্রার্থনার জায়গা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ব্যবস্থা। ফলে কর্মীদের কিছু প্রয়োজন কর্মস্থলের মধ্যেই মেটানো সম্ভব হয়। নারী শ্রমিকের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি বিবেচনায় শিশুদের দেখাশোনার ব্যবস্থা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য শিশুযত্নের সুযোগ থাকা কাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলানো সহজ করতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার প্রকৃত সুফল কতটা, তা জানতে ডে-কেয়ার ব্যবহারকারী শ্রমিকের সংখ্যা, সেবার সময়সূচি এবং কর্মীদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কেও তথ্য প্রয়োজন। আরআইবিএর প্রকল্পবিবরণে বলা হয়েছে, কর্মীরা ছুটির সময়ও পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে ভবনটিতে আসতে পছন্দ করেন। অর্থাৎ তাঁদের কাছে কর্মস্থলটি কেবল জীবিকা অর্জনের জায়গা নয়; এটি এমন একটি পরিসর, যার সঙ্গে তাঁদের আবেগ ও আত্মমর্যাদার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পেছনের গল্প এই কারখানার পেছনে রয়েছেন কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা শফিকুল আলম সেলিম। ১৯৯১ সালে তিনি রংপুরে হারিয়ে যেতে বসা শতরঞ্জি তৈরির ঐতিহ্যকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের সঙ্গে আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার সংযোগ ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। কারখানাটির নকশায় শফিকুল আলম সেলিমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্থপতির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একজন উদ্যোক্তার, যিনি প্রচলিত শিল্পভবনের ধারণার বাইরে গিয়ে শ্রমিকদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশের জন্য জায়গা রাখতে আগ্রহী। এখানে স্থাপত্য ও ব্যবসার সম্পর্কটি তাই শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিল্প পরিচালনার দর্শনের সঙ্গেও যুক্ত। নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের স্থাপত্যচিন্তা এবং উদ্যোক্তার উদ্যোগ মিলেই তৈরি করেছে এই কারখানা। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সেই সম্মিলিত প্রচেষ্টারই মূল্যায়ন। বাংলাদেশের পোশাক ও শিল্পকারখানার প্রসঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। সেই বিপর্যয় দেখিয়েছিল, ভবনের নিরাপত্তা ও শ্রমিকের জীবনের প্রশ্নে অবহেলার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি রানা প্লাজার সরাসরি বিপরীত উদাহরণ—এমন দাবি করার আগে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, দুটি ভবনের নির্মাণ, ব্যবহার ও ঝুঁকির ধরন এক নয়। তবে এই কারখানা শিল্পভবন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: নিরাপত্তা ও উৎপাদনক্ষমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমিকের স্বাচ্ছন্দ্য, স্বাস্থ্য, প্রকৃতির সংস্পর্শ এবং মর্যাদার জন্যও কি স্থাপত্য পরিকল্পনা করা যায় না? এর উত্তর এই ভবনটি ইতিবাচকভাবে দিয়েছে। শিল্পকারখানাকে কেবল যন্ত্রপাতি ও উৎপাদনের কাঠামো হিসেবে না দেখে মানুষকে কেন্দ্রে রেখে ভাবলে নকশা কীভাবে বদলাতে পারে, তা এখানে দেখা যায়। তবে একটি সুন্দর ভবনই সব শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করে না। মজুরি, কর্মঘণ্টা, চাকরির নিরাপত্তা, শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিন ফিল্ডের স্থাপত্যগত সাফল্যকে বৃহত্তর শ্রমপরিবেশের বিকল্প নয়, বরং উন্নত কর্মক্ষেত্র গড়ার একটি সম্ভাবনাময় মডেল হিসেবে দেখা উচিত। স্থাপত্যের নতুন পরিচয় বাংলাদেশের আরেকটি স্থাপনা সাতক্ষীরার ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল ২০২১ সালে আরআইবিএর আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিল। স্থপতি কাশেফ চৌধুরীর নকশায় নির্মিত হাসপাতালটি স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্কের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির স্বীকৃতি সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্থাপত্যকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। এই অর্জনের তাৎপর্য শুধু বিদেশে একটি পুরস্কার জেতা নয়। এটি দেখায়, বিশ্বমানের স্থাপত্যের জন্য সব সময় ব্যয়বহুল উপকরণ, জটিল প্রযুক্তি কিংবা চোখধাঁধানো আকৃতিই প্রধান নয়। স্থানীয় জলবায়ু, বসতবাড়ির অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির ব্যবহার, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েও আন্তর্জাতিক মানের স্থাপত্য তৈরি করা সম্ভব। রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি শুধু একটি কারখানা নয়; এটি শিল্পায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ। উৎপাদন বাড়ানো জরুরি, কিন্তু সেই উৎপাদনের জন্য যাঁরা শ্রম দেন, তাঁদের জীবন কেমন হবে, সেটিও শিল্পের সাফল্যের অংশ হওয়া উচিত। একটি ভবন কতটা উঁচু, কতটা বড় কিংবা কতটা ব্যয়বহুল—এসবের বাইরে গিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, সেটি মানুষের জীবনকে কতটা উন্নত করছে, তাহলে স্থাপত্যের মূল্যায়নের মানদণ্ড বদলে যায়। রংপুরের এই কারখানার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সেই পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিরই একটি শক্তিশালী উদাহরণ।