হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যের যে ওষুধ এক মাস দেওয়া যেত, সেটি ফুরিয়ে যাচ্ছে এক দিনেই। ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘অপারেশন প্ল্যান’ বাতিলের পর বেতন বন্ধ থাকলেও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন থেকে হাসপাতালটির ২৭ কর্মকর্তা সপ্তাহ দুই আগেও যেখানে এক-দেড়শ রোগী আসতেন, সেখানে প্রতিদিন রোগী আসছেন প্রায় দেড় হাজার। সবগুলো বেডে রোগী, অনেকে ভর্তি হতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন। রাজধানীর মিরপুরে সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি রোগীর এমন চাপ বেড়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এত রোগী সামাল দেওয়ার মত পরিস্থিতি তাদের নেই। হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যের যে ওষুধ এক মাস দেওয়া যেত, সেটি ফুরিয়ে যাচ্ছে এক দিনেই। সোমবার দুপুরে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসকের কক্ষ পর্যন্ত লাইন চলে গেছে মূল ফটক পর্যন্ত। বারান্দাজুড়ে রোগী, বসারও জায়গা নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর চিকিৎসক দেখিয়ে ব্যবস্থাপত্র নিতে পারছেন রোগীরা। ১০০ শয্যার এ হাসপাতালটিতে ১০ টাকার টিকেটে চিকিৎসকের পরামর্শ পাচ্ছেন রোগীরা। সঙ্গে বিনামূল্যে প্রাথমিক কিছু ওষুধও পাচ্ছেন তারা। হাসপাতালের নিচ তলায় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও দ্বিতীয় তলায় চলছে ইউনানি চিকিৎসা। তবে সম্প্রতি রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেবা দিতে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের। ভোলা থেকে আসা মো. বিল্লাল নামে এক রোগী বলেন, “ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি একাধিক হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছি। ছয় বছর ধরে বিভিন্ন ডাক্তারের ওষুধ খেয়েছি কিন্তু সুস্থ হইনি। তাই এখানকার প্রাকৃতিক চিকিৎসা নিতে এসেছি।” তিনি বলেন, “মাত্র ১০ টাকায় টিকিট কেটে ডাক্তার দেখালাম। তারাই এক পাতা বিনামূল্যে ওষুধ দিয়েছে, আর দুই মাস পর দেখা করতে বলেছে। ডাক্তার দেখানো পর ভালো লাগছে।” পল্লবীর বাসিন্দা আনিসুর রহমান মেরুদণ্ডের ডিস্ক সরে যাওয়াসহ বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা নিয়ে সোমবার এ হাসপাতালে আসেন। তিনি বলেন, “হাঁটা চলাফেরা সেভাবে করতে পারি না। এখানে চিকিৎসা নিতে চাই, কিন্তু শয্যা ফাঁকা না থাকায় ভর্তি হতে পারছি না।” মুগদার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘‘আমি ও আমার স্ত্রী এসেছি। টিকিট নিয়ে এক ঘণ্টা হল বসে আছি। সিরিয়াল এখনো আসেনি। আমার শরীরের ব্যাথার জন্য এবং স্ত্রীর ডায়াবেটিস সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। তাই এখানের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে এসেছি। কিছুদিন আগে মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখে এখানকার খোঁজ পেয়েছি।’’ গুলশান থেকে সেবা নিতে আসা মাহবুর রহমান বলেন, “আমি গ্যাসট্রিক ও পিএলআইডির জন্য অনেক ওষুধ খেয়েছি, কিন্তু কাজ হয়নি। ভিডিও দেখে এই হাসপাতালের বিষয়ে জেনে এসেছি।” বেড ফাঁকা নেই হাসপাতালটির কর্মকর্তারা বলছেন, দুই সপ্তাহ আগে ৩০ থেকে ৪০ জনের মত রোগী ভর্তি থাকত। বর্তমানে ১০০ শয্যার কোনোটি ফাঁকা নেই। নতুন রোগীদের এত চাপ থাকা সত্ত্বেও কাউকে ভর্তি নেওয়ার মত অবস্থা নেই। হাসপাতালের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, “গত ১৫ দিন ধরে এত রোগীর চাপ, যা সামাল দিতে অতিরিক্ত আটজনকে টিকিট কাউন্টার এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে রাখতে হয়েছে। আসলে এত রোগীদের সেবা দেওয়ার মত অবস্থা নেই। আগে চিকিৎসকরা ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী দেখতেন, এখন ১৩০ জনের বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। এই অল্প জনবল নিয়ে এত চাপ থাকলে আমাদের সেবার মান খারাপ হয়ে যেতে পারে” ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে সেই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাইলে ইচ্ছেমত ওষুধ কিনতে পারি না। এর জন্য একটি পদ্ধতি আছে, সেটির বাইরে কিছু করার সুযোগ নেই।” যেসব সেবা মিলছে হাসপাতালটিতে বর্তমানে আকুপাংচার, পঞ্চকর্ম, ইয়োগা ও হিজামা থেরাপির মাধ্যমে বিভিন্ন চিকিসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালটির কর্মকর্তারা বলছেন, আগে এক দিনে মাত্র ১০ জন আকুপাংচার সেবা পেতেন। এখন সেটি প্রায় ৫০ জন পাচ্ছেন। পঞ্চকর্ম পাঁচজন থেকে ১০ জনকে দেওয়া হচ্ছে। ইয়োগা ৪০ জন এবং হিজামা প্রায় ২০ জন পাচ্ছেন। মোহাম্মদপুর থেকে আসা আবু সাইদ নামে একজন বলেন, ‘‘আমার এক আত্মীয় হিজামা সেবা নিতে চায়। এর জন্য হাসপাতালে এসেছি। চিকিৎসকের কাছ থেকে শুনব কবে নাগাদ সেবা পাওয়া যাবে। সে অনুসারে রোগীকে নিয়ে আসব।” হাসপাতালটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, “এসব থেরাপি দেওয়ার অভিজ্ঞ জনবল এবং শয্যার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের এখানে যা আছে, তা দিয়ে এতদিন চলছিল। কিন্তু হুট করে এত বেশি রোগী থাকায় আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিচ্ছি। এর বাইরে আর দেওয়া সম্ভব নয়।” ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে হাসপাতালটির ২৭ কর্মকর্তার বেতন বন্ধ থাকার কথা বলছেন এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘অপারেশন প্ল্যান’ বাতিলের পর থেকে তাদের বেতন বন্ধ। দুই বছর ধরে তারা বেতন পান না, কিন্তু সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।” ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজে স্নাতক কোর্সে ভর্তি নেওয়া হয় প্রতি বছর। ৫০টি আসনের মধ্যে ব্যাচেলর অব ইউনানি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারিতে ২৫টি আসন এবং ব্যাচেলর অব আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারিতে ২৫টি আসন রয়েছে। এমবিবিএস সমমানের এ ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়। ব্যাচেলর অব ইউনানি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি কোর্স প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক মোসলিম উদ্দিন বলেন, “আমাদের এখানে ভর্তি পরীক্ষার জন্য এএসসি এবং এইচএসসি মিলিয়ে ৮ দশমিক ৫ পয়েন্ট থাকতে হয়। ৫ বছর মেয়াদে স্নাতক ও এক বছরের ইন্টার্নশিপ করতে হয়।” তিনি বলেন, এখানে পড়াশোনা শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে যোগ দেয়। আবার কেউ কেউ বিদেশ গিয়ে আরো উচ্চতর পড়াশোনা করে। সব কিছুর সুযোগ রয়েছে। হোস্টেল সুবধিাসহ অল্প টাকায় শিক্ষার্থীরা এখানে এমবিবিএস সমমান একটি ডিগ্রি অর্জন করতে পারে।” সূত্র: বিডিনিউজ