সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ফ্ল্যাট বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ডের পর আদালতের পরোয়ানার ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাউদ হোসেন বলেন, রাত সাড়ে আটটার দিকে বিদিশাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি একটি প্রতারণা মামলায় দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত। আদালত থেকে পরোয়ানা পাওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফ্ল্যাট বিক্রি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় গত ২০ মে বিদিশা সিদ্দিককে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম ওই রায় দেন। একই সঙ্গে তাঁকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মামলাটি করেছিলেন ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন সিকদার। ২০০৮ সালে গুলশান থানায় করা মামলায় তাঁর অভিযোগ ছিল, রাজধানীর বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট বিক্রির কথা বলে বিদিশা তাঁর কাছ থেকে ৭৫ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। পরে ফ্ল্যাটও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০১ সালে বারিধারায় একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য খোঁজ করছিলেন মোশাররফ হোসেন। সে সময় পরিচিতজনের মাধ্যমে তিনি বিদিশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই বছরের ১ জুলাই বিদিশা তাঁকে প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট দেখান এবং সেটি বিক্রির প্রস্তাব দেন। পরে ফ্ল্যাটটির দাম ৮০ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ জুলাই বিদিশা মোশাররফকে বনানীর রজনীগন্ধা অফিসে ডাকেন। সেখানে তাঁর মনোনীত ব্যক্তি ও বন্ধু আব্দুল রাজ্জাকের নামে ৭৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার দিতে বলা হয়। মোশাররফ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাওরান বাজার শাখার মাধ্যমে ওই অর্থ পরিশোধ করেন। পরে তাঁদের মধ্যে বায়নানামাও সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন নেওয়ার পর বাকি অর্থ পরিশোধ করে ফ্ল্যাটটি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে ২০০২ সালের ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। মোশাররফ হোসেন ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিলে তাঁকে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ৭২ লাখ টাকার একটি চেক দেওয়া হয়। তবে ওই চেক ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর সেটি প্রত্যাখ্যাত হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, বিদিশার হিসাবে প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় চেকটি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এরপরও টাকা ফেরত দেওয়া বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন বাদী। মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, পাওনা টাকা বা ফ্ল্যাট ফেরত চাইলে বিদিশা মোশাররফকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন এবং একপর্যায়ে সন্ত্রাসী দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর চলতি বছরের ২০ মে আদালত বিদিশাকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেন। এরপর আদালত থেকে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। সেই পরোয়ানার ভিত্তিতেই মঙ্গলবার রাতে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বিদিশা সিদ্দিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত একটি নাম। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে ও পরবর্তী বিচ্ছেদ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যের কারণে তিনি সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় ছিলেন। এরশাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সময় তিনি রাষ্ট্রপতির পরিবারের অংশ হিসেবেও পরিচিতি পান। তবে বর্তমান গ্রেপ্তারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্কের কথা পুলিশ বলেনি। পুলিশ জানিয়েছে, এটি আদালতের দেওয়া সাজা এবং সেই মামলায় জারি হওয়া পরোয়ানা কার্যকরের অংশ। এখন বিদিশাকে আদালতে হাজির করার পর পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। দুই বছরের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো আপিল বা অন্য কোনো আইনগত প্রতিকার নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা সাজা কার্যকরের ক্ষেত্রে আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা কী আসে—সেটিও সামনে আসবে। অর্থাৎ, প্রায় দুই দশক আগে একটি ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি ও অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত ফৌজদারি মামলায় গড়ায়। ২০০৮ সালে মামলা হওয়ার ১৮ বছর পর, ২০২৬ সালে সেই মামলায় দেওয়া কারাদণ্ডের পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হলেন বিদিশা সিদ্দিক।