রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের গণভবনসংলগ্ন এলাকার জুলাই জাদুঘর ও জিয়া উদ্যান সিগন্যালের কাছেই দেশে ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন সৌদি প্রবাসী ওমার ফারুক / ছবি- ঢাকা পোস্ট
ছয় বছরের বেশি সময় সৌদি আরবে কাটিয়ে এবার আর প্রবাসে থাকতে হবে না—বাবাকে এমনটাই বলেছিলেন ওমার ফারুক। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সঞ্চয়, স্বর্ণালংকার ও কিছু নগদ সৌদি রিয়াল নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন ৩০ বছর বয়সী এই যুবক। বিমানবন্দরে ছেলেকে নিতে রাতেই অপেক্ষা করছিলেন বাবা দুদু মিয়া। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই পুলিশ পরিচয়ে একদল দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে তাঁর সেই সঞ্চয়ের বড় অংশ হারিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওমার ফারুকের অভিযোগ, শনিবার ভোরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের গণভবনসংলগ্ন জুলাই জাদুঘর ও জিয়া উদ্যানের সিগন্যাল এলাকায় একটি মাইক্রোবাসে করে এসে চার-পাঁচ ব্যক্তি নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেন। গাড়িতে অবৈধ মালামাল থাকার তথ্য পেয়েছেন দাবি করে তাঁরা তল্লাশি শুরু করেন। দেড় মিনিটের মতো সময়ের মধ্যে তাঁর কাছে থাকা ৪ হাজার ৭০০ সৌদি রিয়াল এবং প্রায় ৮৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার নিয়ে তাঁরা চলে যান বলে অভিযোগ করেছেন ওমার। এ ঘটনায় শনিবার শেরেবাংলা নগর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। প্রথমে অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে মামলা নেয়নি পুলিশ। পরে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে মামলা নেওয়ার কথা জানানো হয়। থানায় দেওয়া অভিযোগ ও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ওমার। ২০২০ সালের মার্চে সৌদি আরবে যান তিনি। কেরানীগঞ্জের সুবর্ণসুর গ্রামের দুদু মিয়ার চার সন্তানের মধ্যে তিনি সবার ছোট। প্রবাসে একটি কোম্পানির ইস্যু ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন ওমার। ছয় বছরের বেশি সময় কাজ করে পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোর পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যতের জন্যও অর্থ জমিয়েছিলেন। সেই সঞ্চয়ের একটি অংশ দিয়ে স্বর্ণালংকারও কিনেছিলেন বলে জানান তিনি। বিমানবন্দরে ছেলেকে নিতে আগে থেকেই পৌঁছে গিয়েছিলেন বাবা দুদু মিয়া। সঙ্গে ছিলেন চাচাতো ভাই আব্দুর রহমান ও দুলাল মিয়া। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে রাত সাড়ে ১২টা বেজে যায়। গভীর রাতে রাস্তায় ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় তখনই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হননি তাঁরা। বিমানবন্দরেই অপেক্ষা করেন। ভোর পৌনে ৫টার দিকে প্রাইভেটকারে করে কেরানীগঞ্জের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। কিন্তু বাড়ি পৌঁছানোর আগেই ঘটে যায় ছিনতাইয়ের ঘটনা। ওমারের ভাষ্য, ভোর ৫টা ৬ মিনিটের দিকে জুলাই জাদুঘর ও জিয়া উদ্যানের সিগন্যাল পার হয়ে গাড়িটি বামে ইউটার্ন নেওয়ার সময় পেছন থেকে একটি হায়েস গাড়ি এসে তাঁদের গাড়ির সামনে দাঁড়ায়। ওই গাড়ি থেকে চার-পাঁচজন নেমে নিজেদের পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেন। তাঁরা গাড়িতে অবৈধ মালামাল রয়েছে—এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তল্লাশি করতে চান। ওমার বলেন, তাঁরা আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমরা কোনো কিছু নেব না, শুধু চেক করব।’ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলায় প্রথমে তাঁদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হয়নি বলে জানান ওমার। এরপর তল্লাশির একপর্যায়ে তাঁরা গাড়ির চাবি নিয়ে নেন। পরে তাঁর কাছে থাকা ৪ হাজার ৭০০ সৌদি রিয়াল ও প্রায় ৮৮ গ্রাম স্বর্ণালংকার নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো জিনিস তাঁরা নেননি। ওমার বলেন, পুরো ঘটনা দেড় মিনিটের মধ্যেই ঘটে। চলে যাওয়ার সময় তাঁদের একজন হুমকি দিয়ে বলেন, ‘সোজা যা, কোনো চিল্লাচিল্লি করবি না।’ এ সময় একজনের হাতে ছুরি এবং আরেকজনের হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত লাইট স্টিকের মতো একটি বস্তু দেখেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। ঘটনার পর আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ওমার ও তাঁর স্বজনেরা। দুর্বৃত্তরা চলে যাওয়ার পর তাঁরা আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। সকালে বাড়িতে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান ওমার। ছেলের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সঞ্চয় হারানোর খবর শুনে তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে পরিবার জানিয়েছে। ওমারের বাবা দুদু মিয়া বলেন, ছেলে দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থেকে কষ্ট করেছেন। দেশে ফেরার দিনও গভীর রাতে বাড়িতে না ফিরে নিরাপত্তার কথা ভেবেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের হাতেই তাঁর ছেলের সঞ্চয় চলে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া অর্থ ও স্বর্ণালংকার উদ্ধারের দাবি জানান তিনি। ওমারের চাচাতো ভাই সুলেমান আকাশ বলেন, ‘ছেলেটা পরিবার ফেলে প্রবাসে থেকেছে। রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। কত কষ্ট করেছে। রাতে ফিরেও বাড়ি ফেরেনি ছিনতাইয়ের ভয় থেকে। সেই ওমারই সব হারাল।’ ঘটনার পর শনিবার দুপুরে পরিবারের সদস্যরা আবার ঘটনাস্থলে যান। পরে ঘটনাস্থল শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার মধ্যে পড়েছে নিশ্চিত হয়ে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন ওমার। শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনির বলেন, অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হবে এবং সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর মামলা নেওয়া হবে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করলে দুর্বৃত্তদের ব্যবহৃত গাড়ি, তাদের চলাচলের পথ এবং ঘটনার সময়কার গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে অভিযোগে যে ব্যক্তিরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়েছেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে কোনো বাহিনীর সদস্য কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ওমার বলেন, তাঁর কাছে থাকা অর্থ ও স্বর্ণালংকার শুধু সম্পদ ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ছয় বছরের বেশি সময়ের প্রবাসজীবনের পরিশ্রম, পরিবারের জন্য জমিয়ে রাখা ভবিষ্যতের ভরসা এবং অনেক অপূর্ণ ইচ্ছা। দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই সঞ্চয়ের বড় অংশ হারিয়ে তিনি এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ‘এখনো সন্তানকে কোলে নিতে পারিনি। দেশে ফিরেও ছিনতাইয়ের শঙ্কায় রাতে বাড়ি ফিরিনি। সেই আমিই কি না ছিনতাইয়ের শিকার হলাম’—বলেন ওমার। তিনি জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া অর্থ ও স্বর্ণালংকার উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর পরিবারেরও একই দাবি—দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সঞ্চয় ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ পরিচয়ে এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক।