সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করে তদন্তের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর; পুলিশের গাড়ি ও খননযন্ত্র ভাঙচুর, আহত পুলিশ ও সাংবাদিক রাজধানীর মিরপুরে ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে হকারদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় ডিএনসিসির তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের একটি গাড়ি ও উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত একটি খননযন্ত্র। সংঘর্ষে পুলিশ ও সাংবাদিকদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। পরে অভিযান মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত এলাকায় সম্প্রসারিত হয়। ফুটপাত ও সড়কের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা এবং হকারদের দোকান সরাতে ডিএনসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে যান। তাঁদের সঙ্গে পুলিশও ছিল। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযান চলাকালে প্রথমে একটি স্থানে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে হকার ও সড়কের পাশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় ডিএনসিসির তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং পুলিশের একটি গাড়ি ও একটি খননযন্ত্র ভাঙচুর করা হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দুটি ইউনিট কাজ করে। সংঘর্ষের সময় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রথম আলো জানিয়েছে। সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশ সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীদের আহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। মিরপুর মডেল থানার ডিউটি অফিসার মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা নিশ্চিত করেছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এবং আহত ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। ঘটনার বিষয়ে বুধবার সচিবালয়ে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর কাছে আসা তথ্য অনুযায়ী, উচ্ছেদ অভিযানের দায়িত্বে থাকা সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে পুলিশের যথাযথ যোগাযোগ হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি জেনেছি, এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত যিনি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন সিটি করপোরেশনের, পুলিশের সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগটা সম্পন্ন করেননি।” তিনি আরও বলেন, “সমন্বয়ের অভাব ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। তারপরও আমরা তদন্ত করতে দিয়েছি।” অভিযানের আগে পুলিশকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন ও যোগাযোগে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সংঘর্ষের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা সংস্থাকে দায়ী করা যাচ্ছে না। সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন এক-দুটি ঘটনা দিয়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগের প্রসঙ্গেও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যাচ্ছে, মামলা নিচ্ছে এবং গ্রেপ্তার করছে বলেও দাবি করেন তিনি। পুলিশ বা সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ নাকচ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো ঘটনায় ব্যবস্থা না নিলে বা পুলিশ ব্যর্থ হলে দায়ের প্রশ্ন আসে। মিরপুরের ঘটনার বিষয়ে তদন্তের ফল পাওয়ার আগেই সার্বিক ব্যর্থতার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম। এদিকে রাজধানীর রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় এক পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, ওই কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ওই ঘটনায় একজন সংসদ সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তাধীন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষের পর ডিএনসিসির পক্ষ থেকে প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের সাংবাদিকদের ব্রিফ করার কথা জানানো হয়েছিল। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ঘটনার কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং পরবর্তী উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফুটপাত দখলমুক্ত করা নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হলেও এ ধরনের অভিযান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং জনসাধারণকে আগাম অবহিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মিরপুরের ঘটনায় সমন্বয়হীনতা সংঘর্ষের কারণ হয়ে থাকলে তা তদন্তে নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে প্রধান কাজ।